TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকবাংলাদেশ

অস্থিরতার ছায়ায় ২০২৬ঃ দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচন, সংঘাত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির বছর

একটি রাজনৈতিকভাবে উত্তাল ২০২৫ সালের পর ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়া প্রবেশ করছে গভীর অনিশ্চয়তা নিয়ে। রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার সম্মিলিত প্রভাব নতুন বছরে এই অঞ্চলকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে। বৈশ্বিক শক্তির পরিবর্তনশীল অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একাধিক বড় ঝুঁকি।

 

২০২৬ সালের শুরুতেই বাংলাদেশ ও নেপালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন। দুই দেশেই এটি গণআন্দোলনের পর প্রথম ভোট, যার মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কে.পি. শর্মা ওলি। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় এক বছর সংস্কার কার্যক্রম চালানোর পর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে নেপালের অস্থায়ী সরকার দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পথে হেঁটে ৫ মার্চ ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়।

উভয় দেশেই তরুণদের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের স্মৃতি এখনো তাজা, ফলে নির্বাচন নিয়ে সামান্য সন্দেহ বা ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে নতুন করে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই নির্বাচনগুলো ভারত ও চীনের কৌশলগত স্বার্থের কারণেও গভীর নজরে রয়েছে।

পাকিস্তানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন বছরে উদ্বেগের বড় কারণ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে একটি সন্ত্রাসী হামলা বা সীমান্ত ইস্যুই সামরিক সংঘাতের সূচনা ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত সীমান্তপারের হামলা দমনে তালেবান সরকারের নিষ্ক্রিয়তা পাকিস্তানকে কঠোর পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আফগান ভূখণ্ডে সম্ভাব্য পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের জবাবে পাল্টা হামলার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আঞ্চলিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এই উত্তেজনা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাঁধেই রয়ে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে মালদ্বীপ হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন দুর্বল কড়ি। বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও উচ্চ ঋণের কারণে দেশটি গুরুতর ঋণঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১৩৫ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার বড় অংশই চীনা ঋণ। যদিও পর্যটন খাতের আয় ও ভারতের আর্থিক সহায়তায় এখনো বড় সংকট এড়ানো গেছে, তবে বৈশ্বিক বাজারে ধাক্কা বা পর্যটন খাতে পতন হলে পরিস্থিতি দ্রুত শ্রীলঙ্কার মতো রূপ নিতে পারে।

ভারতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও ২০২৬ সাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইঙ্গিতবাহী বছর হতে যাচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মোদি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক নেতা। সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য তার জনপ্রিয়তা বজায় থাকার ইঙ্গিত দিলেও, ২০২৯ সালে তিনি চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রার্থী হবেন কি না—এ নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে দলের পারফরম্যান্স মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চীন নীতির পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একদিকে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে সহযোগিতার বার্তা দিচ্ছে। যদি ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের প্রতি নরম অবস্থান নেয়, তাহলে চীনকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের কৌশলগত ভিত্তি দুর্বল হতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ পেলেও, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে নতুন চাপের মুখে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য হতে যাচ্ছে একটি পরীক্ষার বছর—যেখানে গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা, আঞ্চলিক শান্তি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একসঙ্গে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়াবে। এই পরীক্ষায় ব্যর্থতা নতুন অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে, আর সাফল্য অঞ্চলটির জন্য খুলে দিতে পারে তুলনামূলক স্থিতিশীল ভবিষ্যতের পথ।

সূত্রঃ ফরেইন পলিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে ‘উগ্র’ মন্তব্যের জের, ইসরায়েলের দুই মন্ত্রীকে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা

বিতর্কের ঘেরাটোপে যুব উপদেষ্টাঃ চাঁদাবাজি থেকে পারিবারিক প্রভাবের অভিযোগ

আইনজীবী আলিফ হত্যাঃ তদন্ত কমিটির সব সদস্যের পদত্যাগ