ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘোষিত অবস্থান এক হলেও তাদের কৌশলগত লক্ষ্য যে ভিন্ন—তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে একসঙ্গে অগ্রসর হলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্বার্থে ফাটল দৃশ্যমান হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই ইরানে “শাসন পরিবর্তন”-এর কথা বলছেন। তবে ইরানের বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব—সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পরও ইরানের ভেতরে প্রত্যাশিত গণঅভ্যুত্থান দেখা যায়নি।
প্রথম ধাক্কায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। আকস্মিক হামলা ও আকাশ-সমুদ্রপথে লক্ষ্যভিত্তিক আঘাতের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব কাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমিত প্রতিক্রিয়া এবং এশীয় শক্তিগুলোর নীরবতা এই ধারণাকে আরও জোরদার করেছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সাফল্য মূলত তাৎক্ষণিক ও রাজনৈতিক। নেতানিয়াহুর জন্য ইরান ইস্যু একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ। গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মধ্যে ইরানে দৃশ্যমান “জয়” তাকে আবারও নিরাপত্তা রক্ষাকারী নেতার ভাবমূর্তি দিতে পারে।
ইসরায়েলি সামরিক নেতৃত্বও একটি বড় সাফল্য চাইছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার দায় ও নিরাপত্তা ব্যর্থতার সমালোচনার পর একটি “ঐতিহাসিক বিজয়” তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পক্ষে ইসরায়েলের ভেতরে প্রণোদনা রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের অগ্রাধিকার ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ শুরুর সমালোচনা তার ওপর বাড়ছে। তাই তিনি দ্রুত ফল দেখিয়ে অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার চাপ অনুভব করতে পারেন।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে স্থলবাহিনী মোতায়েনের সীমা টেনেছেন। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় জনসমর্থন তার নেই বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঝুঁকিও তত বাড়বে।
ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে থাকলে “শাসন পরিবর্তন”-এর ঘোষিত লক্ষ্য প্রশ্নের মুখে পড়বে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্প সমঝোতার ইঙ্গিত দিতে পারেন, কিন্তু নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী থাকতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের বক্তব্যে পার্থক্য স্পষ্ট হবে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সমাপ্তির দিকে যেতে চাইলে ইসরায়েল “যতদিন প্রয়োজন” ততদিন অভিযান চালানোর পক্ষে অবস্থান নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান জোটটি স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সমন্বয়ের ফল হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই নাও হতে পারে। ইরান যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থের এই ভিন্নতা আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনাই এখন বেশি।
সূত্রঃ আল–জাজিরা
এম.কে

