ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার জবাব দিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য যে অবস্থান নিয়েছেন তা সঠিক এবং যুক্তরাজ্য নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপকে তাচ্ছিল্য করে বলেন, ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর কথা ভাবছে। তবে তিনি মন্তব্য করেন, “আমাদের এমন লোকের দরকার নেই যারা যুদ্ধ জয়ের পর এসে যোগ দেয়।”
বর্তমানে ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরী এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলসকে উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে কি না—সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুপার।
বিবিসির অনুষ্ঠান সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুপার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ কী হবে তা নির্ধারণ করা মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব, তবে ব্রিটেনের সরকারও নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।
তার ভাষায়, যুক্তরাজ্য অন্য কোনো দেশের কাছে তার পররাষ্ট্রনীতি আউটসোর্স করবে না এবং সব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত হওয়াও প্রয়োজন নয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলায় যুক্তরাজ্য অংশ নেয়নি। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক হামলা পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থেকে মিত্র দেশগুলোকে রক্ষা করা যায়।
এদিকে সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী স্যার টনি ব্লেয়ার বলেছেন, শুরু থেকেই যুক্তরাজ্যের ওই হামলার পক্ষে থাকা উচিত ছিল। একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য ভিত্তি এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট যেই হোক না কেন—মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
তবে কুপার মনে করিয়ে দেন, ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, অতীতের ভুলগুলো বিবেচনায় রেখে এখন প্রতিটি সিদ্ধান্তই ব্রিটিশ নাগরিকদের স্বার্থকে সামনে রেখে নিতে হবে।
লন্ডনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত সাইয়েদ আলি মুসাভিও যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকা উচিত। তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যদি কোনো সামরিক স্থাপনা বা ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এ ইস্যুতে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। রিফর্ম ইউকে দলের রবার্ট জেনরিক বলেছেন, তাদের দল ইরানের ওপর আক্রমণাত্মক বোমা হামলায় অংশ নেওয়ার পক্ষে নয়, তবে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল।
কনজারভেটিভ দলের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিল্প সরকারকে দায়ী করে বলেন, সম্ভাব্য সংঘাতের আগেই যুদ্ধজাহাজ সাইপ্রাস বা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো উচিত ছিল। তার অভিযোগ, সরকার দূরদর্শিতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমানে জাহাজগুলো এখনও পোর্টসমাউথ বন্দরে রয়েছে।
এরই মধ্যে সাইপ্রাসে অবস্থিত আরএএফ অ্যাকরোটিরি ঘাঁটির রানওয়েতে একটি ছোট ড্রোন আঘাত হেনেছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে সামান্য ক্ষতি হয়েছে। ঘাঁটির নিরাপত্তা জোরদার করতে বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রাগনকে ভূমধ্যসাগরে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরী এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলসের ক্রুদের পাঁচ দিনের মধ্যে যাত্রার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর আগেই ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিমান ও অতিরিক্ত প্রায় ৪০০ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল এবং পরে আরও টাইফুন যুদ্ধবিমান ও ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

