12.1 C
London
May 21, 2024
TV3 BANGLA
Uncategorized

ইসরায়েল-আমিরাতের চুক্তি ও সম্পর্কের নেপথ্যকাহিনী

মধ্য প্রাচ্যের সীমিত ক্ষমতাধর দুটি রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কের স্বাভাবিককরণ চুক্তি সমগ্র  বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। এটি আসলে তাদের গত ২০ বছরের গোপন সম্পর্কের ফল এবং এর কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় নিউ ইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনের উপর ৯/১১-এর হামলা তার জন্য দায়ী। সৌদি হাইজ্যাকাররা দুবাইকে তহবিল স্থানান্তর করার জন্য মূল পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তখন আমিরাতিরা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে মধ্য প্রাচ্যের প্রধান আর্থিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সকলের নিকট তার বিশ্বাসযোগ্যতা পুণর্নির্মাণ ও নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে  ইসরায়েলিদের সাইবার সিকিউরিটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা শুরু করে । লন্ডন ভিত্তিক কর্নারস্টোন গ্লোবাল অ্যাসোসিয়েটসের প্রতিষ্ঠাতা এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলির একজন অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা ঘানিম নুসিবিহ বলেছেন, ৯/১১ এর ঘটনা ছিল সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা যা বুঝিয়ে দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেরা প্রযুক্তির দরকার এবং ইসরায়েলি সংস্থা ও ব্যাংকগুলির সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে দুবাই বৈশ্বিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে তার  অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে।

সময়ের প্রয়োজনে দুই দেশের প্রথমদিকের কারবার অস্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। গত দুই দশক ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের মধ্যে এই ব্যবসায়িক সম্পর্ক কম্পিউটার এর সাহায্যে বিমানবন্দর সুরক্ষা ও নজরদারি  থেকে শুরু করে জাহাজ শিল্প, শোধনাগার, কৃষি প্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেট এবং পর্যটন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় হল গত কয়েক  মাসে COVID-19 -র  ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং চিকিৎসায় ইসরায়েলি গবেষণায় সহায়তা ও অংশগ্রহনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আগ্রহ।

ইরান থেকে হুমকি, আমিরাতিদের বৃহত্তর আঞ্চলিক ইস্যুতে ভূমিকা পালনের আকাঙ্ক্ষা, ফিলিস্তিন ইস্যু এবং ওয়াশিংটনের চাপ সবকিছু মিলিয়ে এই শান্তির চুক্তির জন্ম দিয়েছে মিকা রেখেছে,  ব্যবসায়িক এবং আর্থিক সম্পর্ক, ইস্রায়েলি নাগরিকের প্রাধান্য, প্রতিরক্ষা, এবং গোয়েন্দা প্রযুক্তি সবকিছু মিলে চুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছিল। এখানেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বেশি লাভ রয়েছে।

প্রথম টুইট থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইস্রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইউএই-ইসরাইলের সম্পর্ক নিয়ে কি আশা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল উভয় নেতা তাদের রাজনৈতিক রণাঙ্গনে এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করেন।

নেতানিয়াহু, সম্ভবত দুর্নীতির  একাধিক অভিযোগ পাল্টে দেয়ার আশায়  জেরুসালেম সংবাদ সম্মেলনে এই চুক্তিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের মিশরের সাথে ১৯৭৯ সালের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আইজেক রবিনের জর্ডানের সাথে ১৯৯৪ সালের শান্তি চুক্তির তুলনা করে একে তার সীমিত অধিকার হিসাবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রকৃত শাসক, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ ধীরস্থিরভাবে তাঁর বিবৃতি দান করেন। তিনি একটি টুইটে “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে রোডম্যাপ,” এর বিনিময়ে নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে পশ্চিম তীর দখলের পরিকল্পনা বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির উপর আলোকপাত করেন।  ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস এই চুক্তিটিকে “অসম্মানজনক” বলে উল্লেখ করেন  এবং ফিলিস্তিনি জনগণকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দেয়া ঐতিহাসিক  প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসঘাতকতা বলেন।

তবে নুসিবিহ বলেন যে, মোহাম্মদ বিন জায়েদের সুবিধাগুলি ক্রমান্বয়ে বোঝা যাচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রকাশিত সম্পর্ক রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক সুবিধা এনেছে।

তিনি বলেন, “এই চুক্তি আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রতিভূ হিসাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানকে অত্যন্ত দৃঢ় করেছে,  এমনকি সম্ভবত শীর্ষস্থানীয় হিসেবেও”।  সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং ধর্মীয় সহনশীলতা (আবুধাবিতে একটি ইন্টারফেইথ কমপ্লেক্সে ২০২২ সালে ইহুদিদের জন্য একটি নতুন উপাসনালয় খোলা হওয়ার কথা রয়েছে।)  প্রচারের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তার শক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিস্তৃত প্রয়াসের দিকে ইঙ্গিত করে।

নুসিবিহ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলর সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে দুবাই একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে তার অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। ইসরায়েলি সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত স্টার্টআপ  সংস্কৃতি চালু করতে আগ্রহী। নুসিবিহ মনে করেন , দুবাইয়ের বাইরে কর্মরত ইস্রায়েলি স্টার্ট আপগুলি উভয়ের জন্য অনেক সুযোগ খুলে দেবে

সাধারণীকরণ চুক্তির আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত দুবাইয়ের এক্সপো ২০২০ (এখন ২০২১ সাল পর্যন্ত স্থগিত) এ ইসরায়েলকে তার সংস্থাগুলির  প্রচারের জন্য একটি শিবির তৈরির আমন্ত্রণ জানায়।

জুলাইয়ের প্রথমদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েল ঘোষণা করেছিল যে আবুধাবি ভিত্তিক প্রযুক্তি সংস্থা গ্রুপ  ৪২ ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত ইসরায়েলি সংস্থাগুলির সাথে COVID-19 গবেষণায় কাজ করবে।

বেশ কয়েক মাস ধরে, নেতানিয়াহুর পশ্চিম তীরের প্রায় ৩০ শতাংশ ভূমি ইসরায়েলের আওতায় রাখার ঘোষণা দানের প্রতিশ্রুতির ফলে ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভ ও বিশ্বজুড়ে নিন্দা প্রকাশের কারণে নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়িক জোট অনীশ্বিপদের মুখে পরে গিয়েছিল। ওয়াশিংটনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত, ইউসেফ আল-ওতাইবা, ইসরায়েলিদের তাদের দেশটির শীর্ষ সংবাদপত্রে ভূমিদখল বন্ধের আহ্বান জানিয়ে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। হিব্রু ভাষায় বিধৃত কলামে ওতাইবা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের একাধিক উদাহরণ তুলে ধরে এই মর্মে সতর্ক করে দেয় যে, এই অঞ্চলগুলো দখল করা হলে এই সমস্ত উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাবে।

নেতানিয়াহু আপাতত এই উদ্যোগ স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছেন, এই দুই দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে যে এই বন্ধন চিরকালের জন্য হতে পারে। হোয়াইট হাউস, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে তারা বিনিয়োগ, পর্যটন, প্রত্যক্ষ ফ্লাইট, নিরাপত্তা, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি, শক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, পারস্পরিক দূতাবাস স্থাপন সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আগামী সপ্তাহে বৈঠক করবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দু’দেশের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপিত হলে তা  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বৃদ্ধি, এবং জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করবে।

বিশিষ্ট আমিরাতীদের মধ্যে ইসরায়েলি বা ইহুদি বিনিয়োগকারীদের সাথে যারা ব্যবসা করছেন তাদের মধ্যে, ‘আন্তর্জাতিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড’ এর  চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়মান এবং দুবাই এ বিশ্বের বৃহত্তম আকাশচুম্বী ১৬৩ তলাবিশিষ্ট ভবন  বুর্জ খলিফা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এমার প্রপারটিসের  প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলাব্বার অন্যতম।

উই ওয়ার্ক-এর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক আবুধাবির স্বায়ত্তশাসিত সম্পদ তহবিল মুবাডালা ইনভেস্টমেন্ট কো:, ইসরায়েলি-আমেরিকান উদ্যোক্তা অ্যাডাম নিউম্যানকে  শেয়ারিং ব্যবসায় আরম্ভ করার সময় তার দফতরে বিলিয়ন পরিমাণ অর্থ ঢালে। যেসব ইসরায়েলিরা আমিরাতিদের সাথে ব্যবসায়িক এবং ক্রমবর্ধমান সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠার পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে জিম ইন্টিগ্রেটেড শিপিং সার্ভিস-এর শেয়ারহোল্ডার নিয়ন্ত্রক ইডান ওফার এবং হীরা ব্যবসায়ী লেভ লেভিভ।

২০০৬ সালে সম্পর্ক আরো মজবুত হয় যখন আমেরিকার টার্মিনাল অপারেশন কেনার ব্যর্থ চেষ্টার সময় ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর পক্ষে ইসরায়েলের ধনী পরিবার এর মধ্যে ধনকুবের ওফার তদবির করেছিলেন।

তৎকালীন মার্কিন সিনেটর হিলারি ক্লিনটনকে লেখা এক চিঠিতে ওফার ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ এর  কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে সাক্ষ্য দেন এই মর্মে যে তার নিজস্ব কোম্পানির জাহাজ ববসাকে দুবাই পরিচালিত বন্দরে বিশেষত আরব দেশগুলিতে “অত্যন্ত আরামদায়ক” করে তুলেছিল। ইসরায়েলিদের সাথে অফিসিয়াল সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে।

এই সমস্ত সংযোগ এখন বন্ধ হয়ে গেছে। বুটিক ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম  মেরিলেবোন এলএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কালম্যান স্পর্ন বলেছিলেন, ট্রাম্পের ঘোষণাটি ২০ বছরের পুরনো সম্পর্ক তুলে ধরেছে। মধ্য প্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন এই তিন শক্তি অবশেষে বিশ্বকে জানিয়েছে যে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একসাথে কাজ করছে।

ট্রাম্পের মধ্য প্রাচ্যের প্রাক্তন দূত  এবং ইস্রায়েলি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাসমূহের বর্তমান  প্রতিনিধি জেসন গ্রিনব্ল্যাট বলেছেন,  উপসাগরীয় দেশগুলির বেশিরভাগ ব্যবসায়ী এখন বুঝতে পেরেছেন যে ইসরায়েলি সংস্থাগুলির সাথে ব্যবসায় না করার দিন শেষ হয়েছে। তারা উপলব্ধি করছে যে ইসরায়েলের সাথে ব্যবসা না করা প্রত্যেকের জন্য প্রতিক্রিয়াশীল ছিল। সৌদি, ওমানিস এবং বাহরাইনিসগণ ও  শিগগিরই একইরকম উপলব্ধি করতে পারবে।


তথ্যসূত্র: জোনাথন এইচ ফারজিগার ,  দ্য গার্ডিয়ান
রূপান্তর: শামীমা আলম, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

আরো পড়ুন

‘অস্ত্রের দ্রুত বিস্তারের মাধ্যমে বিশ্ব বিপজ্জনক যুগে প্রবেশ করছে’

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট বাইডেন

অনলাইন ডেস্ক

পার্টিগেট: লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কয়েকটি ছবি