ব্রিটেনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া ধর্মীয় বক্তা এবং তাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া মসজিদ পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করেছে সরকার। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘৃণা ছড়ানো বা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে দাতব্য সংস্থার ট্রাস্টি ও পরিচালকদের দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার শর্তও নাও থাকতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। সরকারের প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো, দাতব্য সংস্থার অর্থ, সম্পত্তি বা প্রাঙ্গণ ব্যবহার করে জাতি, ধর্ম কিংবা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়ানো বন্ধ করা।
সরকারের প্রস্তাবিত পরামর্শ প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে, কোনো ট্রাস্টি যদি এমন বক্তাকে আমন্ত্রণ জানান বা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন, যেখানে কোনো জাতি, ধর্মীয় গোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করা হয়, তাহলে তাকে দাতব্য সংস্থা পরিচালনার অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে। কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কিংবা তাদের নিশ্চিহ্ন করার আহ্বানকেও প্রস্তাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দাতব্য সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা চ্যারিটি কমিশনের বার্ষিক সভায় বৃহস্পতিবার কমিশনের নেত্রী ডেম জুলিয়া আনউইন বলেন, অপরাধ সংঘটনকারীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে কোনো দাতব্য সংস্থা ব্যবহৃত হোক, তা তারা চান না। তিনি বলেন, জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং সহিংসতাসংক্রান্ত অপরাধ থেকে দাতব্য খাতকে সুরক্ষিত রাখতে কমিশনের ক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তবে নতুন ক্ষমতার প্রয়োগ যথাযথভাবে নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
ইসরায়েল-গাজা সংঘাতকে কেন্দ্র করে দাতব্য সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চ্যারিটি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দাতব্য সংস্থাগুলোকে ঘিরে ৪০০টির বেশি তদন্তমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য অপরাধের সন্দেহে পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে ৮০টির বেশি অভিযোগ।
প্রতিবেদনে লন্ডনের রেডব্রিজ ইসলামিক সেন্টারের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার কয়েক দিন পর ওই কেন্দ্রের এক ইমাম ইহুদি ও ইসরায়েলিদের সন্তানদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করে বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মেট্রোপলিটন পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও পরে দণ্ড নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত বন্ধ করে। প্রায় তিন বছর পরও চ্যারিটি কমিশন এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি বলে দ্য সান জানিয়েছে।
এ ছাড়া ম্যানচেস্টারের আল-সুন্নাহ মসজিদে ২০২৪ সালে এক ইমামের ইহুদিদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে কমিশন প্রাথমিক মূল্যায়ন শুরু করে। লন্ডনের ব্রেন্ট এলাকার একটি মসজিদে ইসরায়েল ও জায়নবাদবিরোধী বক্তব্যের ঘটনায় ট্রাস্টিদের আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। নটিংহামের ইসলাম ইনফরমেশন পয়েন্টের এক ট্রাস্টিকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পালনে নিষিদ্ধও করা হয়।
তবে সরকারের প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। ন্যাশনাল সেক্যুলার সোসাইটির মেগান ম্যানসন বলেছেন, প্রস্তাবে নারী ও সমকামীসহ এলজিবিটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তার মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপমানজনক বক্তব্য প্রচারের সমস্যাও মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট অ্যান্টিসেমিটিজম উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থাটির এক মুখপাত্রের মতে, দাতব্য খাতে চরমপন্থা মোকাবিলায় এ উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। ফেইথ ম্যাটার্সের প্রতিষ্ঠাতা ফিয়াজ মুঘলও প্রস্তাবটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তার মতে, কোনো বক্তা পুরো কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ধারণা ছড়ালে সেটিও যেন ব্যবস্থার আওতায় আসে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চ্যারিটি কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্য কেবল নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা নয়; বরং দাতব্য সংস্থাগুলোকে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত রাখা। সরকার এখন প্রস্তাবগুলো নিয়ে পরামর্শ গ্রহণ করছে। ফলে এগুলো এখনো চূড়ান্ত আইন নয়; পরামর্শ প্রক্রিয়া শেষে সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত পরিবর্তন নির্ধারিত হবে।
সূত্রঃ দ্য সান
এমকে

