19.9 C
London
October 1, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

তুরস্কে ‘নূহের নৌকা’র খোঁজে পাহাড় খননঃ ভূগর্ভে মিলল অস্বাভাবিক কাঠামোর সন্ধান

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় ধর্মীয়ভাবে আলোচিত ‘নূহের নৌকা’র সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুরুপিনার ফরমেশন নামের নৌকার আকৃতির ভূতাত্ত্বিক গঠনটি এবার আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করছেন তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা।

গবেষণায় জিপিএস জরিপ, দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি, অরথোফটো ম্যাপ এবং ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্তে বিশেষায়িত রাডার ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে কোর ড্রিলিং ও মাটির নমুনা সংগ্রহের কাজও চলছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু ও দেশটির সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বর্তমান গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তুরস্কের সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলা। তার সঙ্গে কাজ করছেন মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স।

গবেষকদের রাডার জরিপে মাটির প্রায় ৭ মিটার নিচে কয়েকটি ফাঁপা বা শূন্যস্থান শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর কিছু সম্ভাব্য কক্ষ কিংবা করিডরের মতো দেখতে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। এসব কাঠামোর প্রকৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে বর্তমানে ড্রিলিং ও নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নোয়া’স আর্ক স্ক্যানস’ নামের অভিযানে গবেষকদের দাবি, ভূগর্ভে শনাক্ত হওয়া একটি সম্ভাব্য করিডর ২৫০ ফুটেরও বেশি দীর্ঘ। পরবর্তী পর্যায়ে সরু কোর ড্রিলের মাধ্যমে এসব স্থানে ‘গোফার’ নামের একটি বিশেষ রোবট পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। রোবটটি উচ্চ রেজ্যুলেশনের ভিডিও ধারণের পাশাপাশি মাটির নমুনা সংগ্রহ করতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।

তবে গবেষণায় পাওয়া কাঠামোগুলো যে নূহের নৌকার অংশ, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আনাদোলুর প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, নৌকার আকৃতির এই ভূতাত্ত্বিক গঠনের ভেতরে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে—এমন বিষয় এখনো নিশ্চিত হয়নি।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে অ্যান্ড্রু জোন্সের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ফরমেশনটির ভেতরের ও বাইরের মাটির মধ্যে জৈব পদার্থের পরিমাণ এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে।

জোন্সের দাবি অনুযায়ী, ভেতরের মাটিতে বাইরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব পদার্থ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ভেতরের মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি এবং পিএইচ মাত্রাতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। গবেষকদের ব্যাখ্যায়, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আবদ্ধ পরিবেশে জৈব পদার্থের ক্ষয় হলে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে এই ফলাফলকে নূহের নৌকার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

দুরুপিনার ফরমেশনকে ঘিরে রহস্য অবশ্য নতুন নয়। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণের সময় অস্বাভাবিক আকৃতির এই ভূতাত্ত্বিক গঠন শনাক্ত করেন। এরপর থেকেই এটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচনায় আসে।

তবে কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো হলেও নূহের নৌকার সঙ্গে এই স্থানের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি। বরং বিজ্ঞানীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে এটিকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছেন। ১৯৯৬ সালের একটি গবেষণাতেও ফরমেশনটিকে নূহের নৌকার অংশ না বলে প্রাকৃতিক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল বলে নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আধুনিক ভূতাত্ত্বিকদের একটি অংশের মতে, চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির সমন্বয়ে তৈরি এই গঠন দীর্ঘ সময়ের ক্ষয়প্রক্রিয়ার কারণে নৌকার মতো আকৃতি পেয়েছে।

এর আগে মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ডও গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডারের মাধ্যমে এলাকাটি পরীক্ষা করেছিলেন। একপর্যায়ে তিনি এটিকে প্রাচীন জাহাজের জীবাশ্মীভূত অবশিষ্টাংশ বলে মনে করেছিলেন। তার মাপ অনুযায়ী ফরমেশনটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৬৪ মিটার, যা বাইবেলে বর্ণিত নূহের নৌকার প্রায় ১৫৭ মিটার দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। তবে পরবর্তীতে ফ্যাসোল্ড নিজেই নূহের নৌকা সম্পর্কিত ওই তত্ত্ব থেকে সরে এসেছিলেন বলে নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে।

ফরমেশনের আশপাশে পাওয়া কয়েকটি বড় পাথর নিয়েও নূহের নৌকার তত্ত্বের সমর্থকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ এগুলোকে প্রাচীন জাহাজের নোঙর হিসেবে দাবি করেছেন। অন্যদিকে সংশয়বাদীরা এগুলোকে স্মৃতিচিহ্ন বা সমাধিফলক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

২০১৯ সালে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার স্ক্যানেও ফরমেশনটির নিচে অস্বাভাবিক কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল বলে ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান গবেষকরা আগের এসব তথ্যের পাশাপাশি নতুন নমুনা ও রাডার তথ্য বিশ্লেষণ করছেন।

এদিকে চলমান অনুসন্ধান নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দল বর্তমানে এলাকায় কাজ করছে। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অভিযাত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপক বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলও রয়েছে।

তুরস্কের ফিল্ম কমিশনের প্রেসিডেন্ট সাইত ইয়ারদিমজি বলেছেন, আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য দোগুবায়াজিতকে বেছে নেওয়া হলে অঞ্চলটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়তে পারে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, সংগৃহীত মাটির নমুনাগুলোর আরও বিশদ বিশ্লেষণ করা হবে। অধ্যাপক জানকার আতিলার ভাষ্য অনুযায়ী, শীতকালজুড়ে নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হবে এবং কয়েক মাসের মধ্যে প্রাথমিক ফল পাওয়া যেতে পারে। এরপর গবেষকরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার পরিকল্পনা করছেন।

তবে পাহাড়ি এলাকায় শীতের কারণে গবেষণা কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে চলমান অনুসন্ধানের কিছু অংশ আগামী বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে। গবেষণা দলটি আগামী বছর এবং তার পরের বছরও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্যে নূহের নৌকা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফলে দুরুপিনার ফরমেশনটি সত্যিই নূহের নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হলে স্থানটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধর্মীয় ও পর্যটন—দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

তবে বর্তমান পর্যায়ে গবেষণায় পাওয়া রাডার সংকেত, ভূগর্ভস্থ কাঠামো এবং মাটির রাসায়নিক পার্থক্যকে সম্ভাব্য অনুসন্ধানী তথ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এগুলো এখনো নূহের নৌকার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। গবেষকদের লক্ষ্য হলো আরও নমুনা, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা।

সূত্রঃ ফক্স নিউজ\নিউইয়র্ক পোস্টে

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করেছেন ট্রাম্পঃ মার্কিন পডকাস্টার

ইরানে হামলা চালাতে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না আরব আমিরাত

আর্জেন্টিনার নতুন প্রেসিডেন্ট কট্টরপন্থী পন্থী জাভিয়ের মিলেই