নয়াদিল্লিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কয়েকজন বক্তার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠেয় একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত নয়াদিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলেনি।
‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ’ শীর্ষক ওই আলোচনা সভার আয়োজন করে এফসিসি। বেলজিয়ামভিত্তিক সংগঠন ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’ ছিল এর সহযোগী আয়োজক। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন নিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা।
তবে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে লিখিতভাবে ‘কিছু বিতর্ক’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
অনুষ্ঠানটির সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির নাম থাকায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। আমন্ত্রিত বক্তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ এবং মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী নুরান নবী।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলম, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের সভাপতি আসিফ ইকবাল, হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম জিলানিসহ আরও কয়েকজনের। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিবিদ ওন্দ্রেজ দোস্তাল এবং জার্মান রাজনীতিবিদ পিটার ফারেনহোল্টজেরও অনুষ্ঠানে থাকার কথা ছিল।
আলোচনা সভার একটি অংশে প্রশ্নোত্তর পর্বও নির্ধারিত ছিল। ফলে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় নতুন কোনো বিতর্ক তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই পুলিশ অনুমতি দেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। তবে এটি দিল্লি পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়।
এর আগে ৫ আগস্ট একই ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাবে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই ঘটনার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে এ ধরনের ‘অবাঞ্ছিত প্ররোচনা’ বন্ধের নিশ্চয়তা চাওয়া এবং শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিও জোরালো করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার জানিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে দেওয়া বক্তব্য ভারত সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।
এবার আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট বক্তাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত আরেকটি অনুষ্ঠানের অনুমতি বাতিল হওয়ায় বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন কোনো বিতর্কে না জড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই হয়তো দিল্লি পুলিশ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যার বিষয়ে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাবের সভাপতি ওয়াইল আওয়াদও অনুষ্ঠানের অনুমতি বাতিলের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত নন বলে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, আয়োজনটি ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন নিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা এবং কেন দিল্লি পুলিশ অনুমতি দেয়নি, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
সব মিলিয়ে, একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার অনুমতি বাতিলের ঘটনাটি শুধু একটি অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং দিল্লিতে বাংলাদেশ নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রশ্ন। ফলে দিল্লি পুলিশের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক
এম.কে

