ইরান ও ইউক্রেন—দুটি পৃথক যুদ্ধক্ষেত্রে একই সময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি, উন্নত অস্ত্রের মজুদ কমে আসা, কংগ্রেসে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের জোরালো হওয়া, ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি পুনর্বিন্যাস এবং হরমুজ প্রণালীর অস্থিতিশীলতায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে জটিল এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ইরান-সংক্রান্ত সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ জন সেনা ও একজন বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৬২৪ জন সেনা ও পাঁচজন ঠিকাদার। একই সময়ে ৪২টি সামরিক বিমান হারানোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে এবং যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় ছাড়িয়েছে ১১৩.৩ বিলিয়ন ডলার।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রথম দফায় ব্যাপক বিমান হামলার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র সংঘর্ষ চলে। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও জুনের শেষ থেকে আবারও সংঘর্ষ বেড়ে যায়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের কারণে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল অস্ত্রের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে একই মাত্রায় দীর্ঘ সময় যুদ্ধ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
এদিকে ইরান যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিনিধি পরিষদে ২১৪-২০৮ ভোটে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সামরিক বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও স্পেস ফোর্সকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গোল্ডেন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নতুন প্রজন্মের এফ-৪৭ যুদ্ধবিমান, বি-২১ বোমারু বিমান এবং সেন্টিনেল আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস (GAO) সতর্ক করেছে, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এদিকে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়ানোর পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) পরিস্থিতিকে বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বড় তেল সরবরাহ বিঘ্ন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৮ ডলার পর্যন্ত উঠে যায় এবং পরে ১১৩ ডলারের আশপাশে অবস্থান করে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে, এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে এবং সার ও রাসায়নিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক কৃষি ও শিল্পখাতেও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে প্রতিটি হামলার জবাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের শীর্ষ নেতারাও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, চতুর্থ বছরে প্রবেশ করা ইউক্রেন যুদ্ধেও উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। রাশিয়া ইউক্রেনের বন্দর ও অবকাঠামোতে ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। ন্যাটো সদস্য রোমানিয়া নিজেদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি রুশ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে, যা সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়া আরও প্রায় ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই দাবির স্বাধীন আন্তর্জাতিক যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বিমান হামলা সীমিত করার সম্ভাব্য একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও রাশিয়া এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইতিবাচক কোনো অবস্থান জানায়নি।
২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৮৮ বিলিয়ন ডলারের সম্পূরক বাজেট অনুমোদন করেছে। এর বড় অংশ ব্যয় হয়েছে ইউক্রেনকে দেওয়া অস্ত্রের মজুদ পুনর্গঠন, ইউরোপে প্রতিরক্ষা জোরদার এবং মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখতে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে একটি সাঁজোয়া ব্রিগেডও রয়েছে। একই সঙ্গে পোল্যান্ডে দীর্ঘমেয়াদি নতুন সামরিক মোতায়েনের পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে।
ন্যাটোর কর্মকর্তারা এটিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়াতেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির পক্ষে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলেও, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের কৃতিত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা গেছে। তবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশলের অংশ হিসেবে ভারতকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইউক্রেন—দুটি সংঘাত একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা শিল্প, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি, অস্ত্র উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনকে এখন একাধিক ফ্রন্টে একই সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। আগামী মাসগুলোতে এই সংকটগুলোর গতিপ্রকৃতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এম.কে

