12.6 C
London
October 18, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশমুক্তমত

নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, আবরার ফাহাদ ও মেজর সিনহা হত্যার বিচার কোন পথে?

নাশীত রহমান              II      লন্ডন    II       ১৮ অক্টোবর ২০২৬

 

আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্র, আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কেবল ব্যক্তির জীবন ও স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; বরং আইনের শাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলোকেও গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।

এই মামলাগুলোর গুরুত্ব শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এগুলোর চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি দেখাতে পারে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, আদালতে তার বিচার হবে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং আইনের সমান প্রয়োগের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে এসব মামলা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীনভাবে প্রমাণ মূল্যায়ন করতে পারে এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত তিনটি হত্যা মামলার আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক। রোববার (১৮ অক্টোবর) আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নির্ধারিত আপিল শুনানির সূচি

১. নারায়ণগঞ্জের সাত খুন               ১৭ নভেম্বর ২০২৬

২. আবরার ফাহাদ হত্যা                   ২৪ নভেম্বর ২০২৬

৩. মেজর সিনহা হত্যা                        ১ ডিসেম্বর ২০২৬

শুনানির তারিখ নির্ধারণের অর্থ এই নয় যে সেদিনই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে। শুনানির ব্যাপ্তি, উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক এবং আদালতের কার্যতালিকার ওপর নির্ভর করবে রায় ঘোষণার সময়।

১. নারায়ণগঞ্জের সাত খুন: রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে ঘটে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। পরে তাঁদের মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার তদন্তে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। মামলায় তৎকালীন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা নূর হোসেনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও অর্থায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয় বলে হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ করা হয়।এই মামলা কেবল সাত ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের বিচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব, অপরাধে সরকারি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে দেশব্যাপী প্রশ্ন সৃষ্টি করে।

মামলার বিচারিক সময়রেখা

* ২৭ এপ্রিল ২০১৪:       নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে নদী    থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

* ১৬ জানুয়ারি ২০১৭: নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

* ২২ আগস্ট ২০১৭:     হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। বাকি ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড    কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। অন্য ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজাও বহাল থাকে।

* ১৮ অক্টোবর ২০২৬: আপিল বিভাগে শুনানির দিন নির্ধারিত হয়।

* ১৭ নভেম্বর ২০২৬:   নির্ধারিত আপিল শুনানির দিন।

আপিল বিভাগে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ? এই মামলায় সর্বোচ্চ আদালত মূলত বিচার করবেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ আইনসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না এবং হাইকোর্টের দেওয়া সাজা বহাল রাখার পর্যাপ্ত ভিত্তি রয়েছে কি না। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ, প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্রের প্রমাণ এবং পৃথক আসামির অপরাধের মাত্রা।

সম্ভাব্য রায় – আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় সম্পূর্ণ বহাল রাখতে পারেন, কোনো কোনো আসামির সাজা পরিবর্তন করতে পারেন অথবা আইনগত ও প্রমাণগত ভিত্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট আসামিকে খালাস দিতে পারেন। উপযুক্ত ক্ষেত্রে পুনর্বিচার বা অন্য প্রয়োজনীয় আদেশও হতে পারে। বিশেষ করে হাইকোর্ট যে ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করেছেন, তাঁদের সাজা নির্ধারণে ব্যবহৃত যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট আপিলের পরিধি ও পক্ষগুলোর আবেদন না দেখে সাজা বাড়ানো বা কমানোর বিষয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া যায় না।

২. আবরার ফাহাদ হত্যা: ভিন্নমত প্রকাশ, ছাত্ররাজনীতি ও ক্যাম্পাসে সহিংসতা

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রকাশিত রাজনৈতিক মতামতকে কেন্দ্র করে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয়েছিল বলে মামলার বিবরণ এবং সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে। হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের প্রভাব নিয়ে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

মামলার বিচারিক সময়রেখা

* ৬ অক্টোবর ২০১৯: বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

* ৮ ডিসেম্বর ২০২১    ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলায় ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

* ৬ জানুয়ারি ২০২২: মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পৌঁছায়।

* ১৬ মার্চ ২০২৫:      হাইকোর্ট ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।

* ১৮ অক্টোবর ২০২৬: আপিল শুনানির দিন নির্ধারিত হয়।

* ২৪ নভেম্বর ২০২৬: নির্ধারিত আপিল শুনানির দিন।

আপিল শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন – আবরার হত্যা মামলায় প্রত্যেক দণ্ডিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ধরনের অপরাধমূলক ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে, তা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। একটি সংঘবদ্ধ হত্যাকাণ্ডে সবাই সমান ভূমিকা পালন না করলেও যৌথ অভিপ্রায় বা অভিন্ন উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে কীভাবে ফৌজদারি দায় নির্ধারিত হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন।

আপিল বিভাগ আরও বিবেচনা করতে পারেন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রমাণ এবং অন্যান্য পরিস্থিতিগত সাক্ষ্য যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়েছে কি না।

সম্ভাব্য রায় – হাইকোর্টের দেওয়া ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সম্পূর্ণ বহাল থাকতে পারে। আবার পৃথক আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণের শক্তি ও অপরাধে ভূমিকার ভিত্তিতে সাজা পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে। এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির ফৌজদারি দায় নির্ধারণে সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের অনুরূপ মামলার বিচারেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

আবরারের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত বিচারিক নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে আসছে। আপিল শুনানির দিন নির্ধারণ তাঁদের সেই প্রত্যাশার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

৩. মেজর সিনহা হত্যা: পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারিক জবাবদিহি

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর পুলিশ তল্লাশিচৌকিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। বিচারিক আদালতও হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত বলে সিদ্ধান্ত দেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং পুলিশি জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

মামলার বিচারিক সময়রেখা

* ৩১ জুলাই ২০২০:    টেকনাফের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে মেজর সিনহা নিহত হন।

* ৫ আগস্ট ২০২০:    তাঁর বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস হত্যা মামলা দায়ের করেন।

* ১৩ ডিসেম্বর ২০২০: র‍্যাব ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

* ২৭ জুন ২০২১:       বিচারিক আদালত ১৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

* ৩১ জানুয়ারি ২০২২: কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাতজনকে খালাস দেওয়া হয়।

* ২ জুন ২০২৫:        হাইকোর্ট প্রদীপ ও লিয়াকতের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।

* ১ ডিসেম্বর ২০২৬: আপিল বিভাগে শুনানির নির্ধারিত দিন।

আপিল বিভাগে যেসব প্রশ্ন গুরুত্ব পেতে পারে – মেজর সিনহা হত্যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশের গুলিবর্ষণ আইনগতভাবে সমর্থনযোগ্য ছিল কি না, হত্যাকাণ্ডের পূর্বপরিকল্পনার প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষভাবে পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে প্রত্যক্ষ ও পরিস্থিতিগত সাক্ষ্য, ঘটনার পর পুলিশের বক্তব্য, ফরেনসিক তথ্য এবং বিচারিক আদালতের প্রমাণ মূল্যায়ন।

সম্ভাব্য রায় – হাইকোর্টের রায় বহাল থাকলে প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকবে। অন্যদিকে আপিল বিভাগ কোনো আসামির দণ্ড পরিবর্তন, খালাস বা আইনসম্মত অন্য আদেশ দিতে পারেন। এই মামলার রায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা এবং দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত অপরাধের জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তিন মামলার তুলনামূলক চিত্র

বিষয় সাত খুন আবরার হত্যা সিনহা হত্যা
ঘটনার বছর ২০১৪ ২০১৯ ২০২০
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল ১৫ জন ২০ জন ২ জন
হাইকোর্টে যাবজ্জীবন ১১ জন ৫ জন ৬ জন
আপিল শুনানির তারিখ ১৭ নভেম্বর ২০২৬ ২৪ নভেম্বর ২০২৬ ১ ডিসেম্বর ২০২৬

 

আইনগত বিশ্লেষণ: আপিল বিভাগ কী ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন? বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগ নির্ধারিত শর্তে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির এখতিয়ার রাখেন। ফৌজদারি মামলায় সর্বোচ্চ আদালত কেবল আইনের ব্যাখ্যাই নয়, প্রয়োজন অনুসারে প্রমাণের মূল্যায়ন ও দণ্ডের আইনগত যথার্থতাও পরীক্ষা করতে পারেন।

এই তিন মামলায় প্রধানত চার ধরনের ফলাফল সামনে আসতে পারে।

প্রথমত, হাইকোর্টের রায় বহাল। আপিল বিভাগ যদি মনে করেন যে অপরাধ প্রমাণ, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দণ্ড নির্ধারণে গুরুতর আইনগত ত্রুটি নেই, তাহলে সংশ্লিষ্ট সাজা বহাল রাখতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, সাজা পরিবর্তন। কোনো আসামির অপরাধে অংশগ্রহণের মাত্রা, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনায় আদালত দণ্ড পরিবর্তন করতে পারেন।

তৃতীয়ত, দণ্ড বাতিল বা খালাস। কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আইনসম্মতভাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে তাঁর দণ্ড বাতিল হতে পারে।

চতুর্থত, পুনর্বিচার বা অন্য নির্দেশনা। বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেলে আদালত উপযুক্ত আইনগত প্রতিকার দিতে পারেন।

তবে এসব সম্ভাবনা সাধারণ ফৌজদারি আপিলের আইনগত পরিসর। তিন মামলার পূর্ণাঙ্গ আপিল নথি, হাইকোর্টের রায়ের যুক্তি এবং পক্ষগুলোর লিখিত বক্তব্য পর্যালোচনা ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ফলাফলের সম্ভাবনা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেই কি তা কার্যকর হবে? এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয় রয়েছে। আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা এবং ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা রয়েছে। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে প্রযোজ্য বিচারিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

বিচারিক বিলম্ব: ন্যায়বিচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার পর ১২ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। আবরার হত্যার সাত বছর এবং মেজর সিনহা হত্যার ছয় বছর পেরিয়েছে। তিন মামলায় বিচারিক আদালত এবং হাইকোর্টের রায় ঘোষণা হলেও সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। বিচারিক বিলম্বের প্রশ্নটি কেবল নিহতদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

প্রতিশোধ নয়, আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠাই বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য – নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, আবরার ফাহাদ এবং মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গভীরভাবে আলোচিত তিনটি ঘটনা। আগামী ১৭ নভেম্বর, ২৪ নভেম্বর এবং ১ ডিসেম্বরের শুনানি তাই শুধু তিনটি হত্যা মামলার পরবর্তী বিচারিক ধাপ নয়; বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা মূল্যায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনসম্মত বিচার প্রয়োজন। কোনো অভিযোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব যত বেশি হোক, তার নিষ্পত্তি হতে হবে তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা অভিযুক্তদের ক্ষমতা—কোনোটিই যেন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নির্ধারণ না করে। একইভাবে, অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার করতে গিয়ে নতুন কোনো অন্যায়, প্রতিহিংসামূলক বিচার বা আইনবহির্ভূত শাস্তির সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে না।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির পরিবর্তে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং মানবাধিকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে নয়, বরং তার প্রয়োগের অপরিহার্য সীমা। এই তিন হত্যা মামলার বিচারিক পরিণতি সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একমাত্র মাপকাঠি হবে না; কিন্তু ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

কারণ, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বিরোধীকে দমন করার ক্ষমতায় নয়, বরং ক্ষমতাবানকেও আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর সক্ষমতায়। ন্যায়বিচার কোনো রাজনৈতিক পক্ষের বিজয় নয়; এটি নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং আইনের শাসনের ভিত্তি।

আরো পড়ুন

গৃহকর্তাকে থাপ্পড় দিয়ে ডাকাত বলল, ‘বাড়িতে সিসি ক্যামেরা কেন লাগিয়েছিস

সাম‌য়িক বরখাস্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাপসী তাবাসসুম, বিভাগীয় ব্যবস্থার প্রক্রিয়া শুরু

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গায়ের স্যুট তৈরি বাংলাদেশেঃ আলোচনায় নারায়ণগঞ্জের কারখানা