২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত নাহিদ ইসলাম এবার সংসদ নির্বাচনের মাঠে। আন্দোলন-উদ্ভূত দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) গড়ে তুলে তিনি রাজপথের নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সেই যাত্রা শুরু হয়েছে এক বিতর্কিত জোটের মাধ্যমে—জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের পর যে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়, তাতে নাহিদ ইসলাম তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। শহীদ মিনারে দেওয়া তার ‘হাসিনাকে যেতে হবে’ স্লোগান আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। সরকার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি অল্প সময়ের জন্য উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ক্ষমতার বাইরে থেকে পরিবর্তন সম্ভব নয়—এই উপলব্ধি থেকেই ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাহিদ ইসলাম এনসিপি গঠন করেন। দলটি নিজেকে মধ্যপন্থী, সংস্কারপন্থী ও ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’-এর বাহক হিসেবে তুলে ধরে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং বিএনপি–আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে ক্লান্ত জনগণের একাংশের কাছে এনসিপি শুরুতে বিকল্প শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্ত এনসিপিকে তীব্র বিতর্কের মুখে ফেলে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা, নারীর নেতৃত্ব ও সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান বহু মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জোট ঘোষণার পর এনসিপির উদারপন্থী অংশের একাধিক নেতা ও নারী নেত্রী দল ছাড়েন।
নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, এটি আদর্শিক নয়, কেবল নির্বাচনী জোট। তার ভাষায়, সংস্কার, দুর্নীতি দমন, সুশাসন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো বিষয়ে দুই দলের মিল রয়েছে। আসন সমঝোতায় ৩০০ আসনের মধ্যে এনসিপি পেয়েছে ৩০টি, জামায়াত ২২২টি এবং বাকি আসনগুলো গেছে অন্যান্য শরিকদের কাছে।
জরিপ অনুযায়ী বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের মতে, ছোট হলেও এনসিপির ভূমিকা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—বিশেষ করে জোট সরকার গঠন ও সংস্কার প্রশ্নে দরকষাকষিতে।
নাহিদ ইসলাম নিজে ঢাকা-১১ আসন থেকে প্রার্থী। এটি আগে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি ছিল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির অভিজ্ঞ নেতা এম এ কাইয়ুম। তবে নাহিদের দাবি, আন্দোলনের সময় সক্রিয় থাকা এই এলাকার মানুষ তাকে আপনজন হিসেবে দেখছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, নাহিদের বড় শক্তি তার আন্দোলনের পরিচিতি এবং জামায়াতের শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, এনসিপি প্রায় পুরোপুরি জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যতে দলটির স্বাধীন পরিচয় সংকটে ফেলতে পারে।
নারী অধিকার ও সংখ্যালঘু ইস্যুতে জোটের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। জামায়াত এবার কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি, যেখানে এনসিপি দিয়েছে মাত্র দুজন। সমালোচকদের মতে, এটি ‘নতুন রাজনীতি’র দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নাহিদ ইসলাম অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, নারী ও সংখ্যালঘু বিষয়ে তার দলের মূল অবস্থান ক্ষুণ্ন হলে জোট টিকবে না। তিনি বলেন, জোট সরকার হলে কোনো একক দলের আদর্শ নয়, বরং সমঝোতার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন নাহিদ ইসলামের জন্য শুধু একটি আসনের লড়াই নয়; এটি নির্ধারণ করবে তিনি আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি টেকসই রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিণত হবেন। নিজেই তিনি বলেছেন, দশ বছরের মধ্যে এনসিপি সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।
এই নির্বাচন সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার প্রথম বড় ও কঠিন পরীক্ষা।
সূত্রঃ আল জাজিরা
এম.কে

