ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এবারের নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কোনো সুস্পষ্ট উপাদান দেখা যায়নি এবং সামগ্রিকভাবে এটি ছিল সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ না নেওয়ায় নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা অন্য দলের প্রার্থী হিসেবে কিংবা স্বতন্ত্রভাবে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ভোটারদের মধ্যেও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বড় একটি অংশ উপস্থিত ছিল। তাই বাস্তব তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক বলা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্য থেকে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতিতে দৈবচয়নের মাধ্যমে ৭০টি আসন নির্বাচন করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আগে, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ের ঘটনাগুলো এতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের প্রায় ৯৯ শতাংশই আচরণবিধির ৫৮টি ধারার কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন। ভোটের দিন বিভিন্ন কেন্দ্রে স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর ওপর হামলা, ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভয়ভীতি প্রদর্শন, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, বানোয়াট নিয়ম দেখিয়ে ভোটারদের হয়রানি, একজনের ভোট অন্যজনের দ্বারা দেওয়া এবং ভোটের সময় টাকা বিতরণের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম ও ছবি না মেলায় অনেক ভোটার কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েও ভোট দিতে পারেননি। একই সঙ্গে ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানায় টিআইবি।
নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষণাধীন আসনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টিতে, ভোটার ও সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ৩৪টিতে, বাড়িঘর ও অফিসে হামলার ঘটনা ১৮টিতে এবং একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি আসনে।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবি বলেছে, শুরুতে তুলনামূলকভাবে সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি আবারও ফিরে এসেছে। এর ফলে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তদলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল।
প্রতিবেদন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত টিআইবির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মো. মাহফুজুল হক বলেন, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত কোনো আসনে একটি মাত্র ঘটনা ঘটলেও সেটি রেকর্ড করা হয়েছে। এখানে শতাংশ হিসাব করা হয়েছে আসনের ভিত্তিতে, মোট ভোটের সংখ্যার ভিত্তিতে নয়—যা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্রঃ প্রথম আলো
এম.কে

