23.2 C
London
August 26, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

নেপালে আকস্মিক বন্যায় ধ্বংসযজ্ঞ, ভেসে গেছে গ্রাম-সেতু-বিদ্যুৎ প্রকল্পঃ নিখোঁজ শত শত

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রবল পানির তোড়ে নেপালের উত্তরাঞ্চলের রসুয়া জেলায় বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এখন পর্যন্ত ৫৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।

নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, বুধবার রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যার পর ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে অন্তত ১০৫ জন ভারতীয় এবং ১২ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন।

ভোতেকোশি নদীর পানি বুধবার সকাল ৯টার দিকে দুই কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করে। মুহূর্তের মধ্যে পানির স্রোত আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বেশ কয়েকটি বসতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানির তোড়ে ঘরবাড়ি ও যানবাহন ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি একটি লোহার সেতুও ধসে পড়ে।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের প্রাথমিক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, একটি বরফধসের কারণে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার পর আকস্মিকভাবে ভোতেকোশি নদীতে পানির চাপ বেড়ে যায়। লেন্দে নদীটি ভোতেকোশির একটি উপনদী।

তবে বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। গত বছরও একই নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। পরে জানা যায়, একটি হিমবাহের হ্রদ থেকে ওই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।

বন্যার পাশাপাশি নেপাল-চীন সীমান্তের তিব্বত অংশেও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিধসের কারণে জিরং বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিগাতসে অঞ্চলে সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সেখানে বেশ কয়েকজন নিখোঁজ হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে এবং ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীন—উভয় দেশের কাছেই সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

বন্যায় বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। নিখোঁজদের অনেকেই কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় অংশ নেওয়া তীর্থযাত্রী বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা তিব্বতের উদ্দেশে সীমান্ত পার হওয়ার পথে ছিলেন।

কাঠমান্ডুভিত্তিক টাচ কৈলাস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বসু কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, ৯৩ জন নেপালিসহ মোট ৩৯০ জন তীর্থযাত্রীর ওই সীমান্ত দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বিকেল ৩টা পর্যন্ত মাত্র কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছিল। বাকিদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান ও তিনজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। আরও ১১১ জন নিখোঁজ ব্যক্তির জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন। আরও ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় কর্মী সেখানে আটকা পড়েছেন। তাদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

রসুয়া জেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় স্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারছে না।

বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পাঠাতে তিনটি হেলিকপ্টার রওনা হলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেগুলোকে কাঠমান্ডুতে ফিরে আসতে হয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

রসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার জানিয়েছেন, পরিস্থিতিতে বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু এলাকায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রসুয়া জেলার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বি কে রয়টার্সকে বলেন, চারদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যাচ্ছে। নদীর পাশের জনবসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। তার নিজের পরিবারের পাঁচ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানান তিনি।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বস্নেত জানিয়েছেন, পানির প্রবাহ না কমা পর্যন্ত দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার নিরাপদে অবতরণ করতে পারবে না।

এদিকে ভয়াবহ বন্যার পর সম্ভাব্য আরও দুর্যোগ মোকাবিলায় সতর্কতা জোরদার করেছে চীন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ তল্লাশি অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। একই সঙ্গে বন্যা-পরবর্তী সম্ভাব্য দুর্যোগ এড়াতে নজরদারি ও আগাম সতর্কসংকেত ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

টেলিভিশনে প্রচারিত বিভিন্ন দৃশ্যে বন্যার পানিতে ভেঙে পড়া বাড়িঘর, ভাসমান গাড়ি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোর চিত্র দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পানির স্রোতে পুরো গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে গেছে।

নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও ভূমিধস নতুন ঘটনা নয়। তবে এবার সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নিখোঁজ পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্ধারে এখন দ্রুত ও সমন্বিত অভিযানই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্রঃ রয়টার্স

এম.কে

আরো পড়ুন

মার্কিন শ্রমনীতি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বি-বার্ষিক মূল্যায়ন রিপোর্ট, উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী মহল

ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সব পথ বন্ধ করছে ইসরায়েল

ইসরায়েলেকে স্বীকৃতি দিচ্ছে সিরিয়া, ‘গোপন প্রতিশ্রুতি’ প্রেসিডেন্টেরঃ মিডিল ইস্ট মনিটির