মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ইরান-এর পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশটি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে গেছে। তবে চূড়ান্ত অস্ত্র তৈরি ও মোতায়েনের ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক বাধা রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য সাধারণত প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রয়োজন। বর্তমানে ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে, যা থেকে অস্ত্রমান পর্যায়ে পৌঁছানো তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও সহজ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এ অবস্থায় “ব্রেকআউট টাইম”—অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে বোমার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তৈরি করতে সময়—উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান চাইলে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যেই একটি পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান প্রস্তুত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে আরও জানা গেছে, বর্তমানে ইরানের হাতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে অন্তত তিনটি বোমার জ্বালানি তৈরি সম্ভব।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকেও ইরান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির উন্নতমানের সেন্ট্রিফিউজ প্রযুক্তি দ্রুতগতিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সক্ষম। পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতে পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনের সক্ষমতাও তাদের রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু জ্বালানি প্রস্তুত করলেই একটি কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব নয়। “অস্ত্রায়ন” প্রক্রিয়া—অর্থাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ছোট আকারের ওয়ারহেডে রূপান্তর করা—একটি জটিল প্রযুক্তিগত ধাপ, যা সম্পন্ন করতে আরও কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক নজরদারি ইরানের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপও দেশটির অগ্রযাত্রাকে সীমিত করছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়াকে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে অগ্রসর হয়, তাহলে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলার পথ বেছে নিতে পারে। এই সম্ভাবনা ইরানকে কৌশলগতভাবে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করছে।
সব মিলিয়ে, ইরান এখন এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করছে যেখানে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন মূলত সময়ের ব্যাপার। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ, কার্যকর এবং মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা এখনো জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবেই রয়ে গেছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
এম.কে

