19.5 C
London
October 4, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশযুক্তরাজ্য (UK)

পূর্ব লন্ডনের এক ইমামের বিতর্কিত বক্তব্যঃ স্ত্রী অবাধ্য হলে ‘হালকাভাবে মারার’ পরামর্শ

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে একটি মসজিদের ধর্মীয় বক্তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্বামীর অবাধ্য হলে স্ত্রীকে শারীরিকভাবে ‘হালকাভাবে আঘাত’ করার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই বক্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মসজিদটির প্রকাশিত ধর্মীয় বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির দাতব্য সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা চ্যারিটি কমিশন।
লন্ডনের হ্যাকনি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারে দেওয়া এক বক্তব্যে ইয়াসিন মুনিয়ে নামের ওই ধর্মীয় বক্তা বলেন, স্বামীর অবাধ্য হলে স্ত্রীকে শাসন করা উচিত। মসজিদটির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ওই বক্তব্যে তিনি ইসলাম ধর্মে গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
বক্তব্যে মুনিয়ে মানজুমাতুল কাবায়ের নামের একটি কবিতা থেকে পাঠ করেন, যেখানে ইসলামে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন কাজের উল্লেখ রয়েছে। এ সময় তিনি স্বামীর অবাধ্য হওয়া, অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়া এবং গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া দাম্পত্য সম্পর্কে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা প্রত্যাখ্যান করাকে পাপের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, “তাকে উপদেশ দিন, বিছানায় তাকে এড়িয়ে চলুন, তার সঙ্গে বিছানায় যাবেন না—এবং শারীরিকভাবেও শাসন করুন। কে কর্তৃত্ব করে, তা বোঝানোর জন্য হালকাভাবে আঘাত করুন।”
ওই বক্তব্য প্রকাশের পর বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও প্রচারাভিযান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের ধর্মীয় বক্তব্য দাম্পত্য সম্পর্কে সহিংসতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণকে উৎসাহিত করতে পারে।
বক্তব্যের অন্য একটি অংশে সমকামী যৌন সম্পর্ককে ‘অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন মুনিয়ে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য শরিয়াহ আইনে শাস্তির বিষয়েও আলোচনা করেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাদের কেউ কেউ তলোয়ারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা বলেছেন।
হ্যাকনি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটি ইসলাম ধর্মের প্রসারসহ মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কথা উল্লেখ করেছে।
প্রকাশিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৭ পাউন্ড। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার পাউন্ড এসেছে অনুদান থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই আয়ের ওপর প্রতিষ্ঠানটিকে কোনো কর দিতে হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিলে সংস্থাটি পুনরায় দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নিবন্ধন করে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সেক্যুলার সোসাইটির (এনএসএস) প্রচার বিভাগের প্রধান মেগান ম্যানসন এ ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দাতব্য মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
ম্যানসন বলেন, হ্যাকনি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার এমন অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের একটি, যেগুলো ধর্মীয় কার্যক্রমের আড়ালে নারীবিদ্বেষ, সমকামিতাবিরোধী মনোভাব এবং অন্যান্য ক্ষতিকর মতাদর্শ প্রচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ধর্মের প্রসারকে দাতব্য কাজ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি জরুরিভিত্তিতে পর্যালোচনা করা উচিত। কারণ, জনকল্যাণের পরিবর্তে এ ধরনের কার্যক্রম বৈষম্য, বিভাজন ও নির্যাতনকে উৎসাহিত করতে পারে।
ন্যাশনাল সেক্যুলার সোসাইটি ইতোমধ্যে হ্যাকনি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারের বিরুদ্ধে চ্যারিটি কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছে। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত বক্তব্য ও কনটেন্ট দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চ্যারিটি কমিশন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তারা এ ঘটনায় একটি নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনা কার্যক্রম শুরু করেছে।
কমিশনের এক মুখপাত্র বলেন, সব দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে—তাদের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন—জনকল্যাণে কাজ করতে হবে এবং সবার জন্য নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, হ্যাকনি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত ধর্মীয় বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি আরও মূল্যায়নের জন্য তদন্ত শুরু হয়েছে। এই পর্যালোচনার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
এর আগে চলতি বছর হ্যাচ এন্ড ইসলামিক সেন্টারের এক ধর্মীয় বক্তার বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। ওই বক্তব্যে তিনি স্ত্রীদের স্বামীর সেবা করাকে ‘বাধ্যতামূলক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে বক্তব্যটি মুছে ফেলা হয়। তবে মসজিদটির দাতব্য মর্যাদা বাতিল না করে চ্যারিটি কমিশন প্রতিষ্ঠানটিকে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সর্বশেষ এ ঘটনা যুক্তরাজ্যে ধর্মীয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় বক্তব্যে বৈষম্য, নির্যাতন কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দাতব্য মর্যাদা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সূত্রঃ লন্ডন লাভস বিজনেস
এমকে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশি দুর্নীতিবাজদের বিলাসী জীবন লন্ডনে, তদন্ত চাইছে আন্তর্জাতিক মহল

বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে আমিরাতের ২ কোম্পানি

কিং চার্লসের দিকে ডিম নিক্ষেপ, গ্রেফতার ১

অনলাইন ডেস্ক