20.3 C
London
September 26, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকবাংলাদেশ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফল জাতিসংঘ সফরঃ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন বার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং জাতিসংঘ সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে এসেছে। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুরু হয়েছে এবং এর সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের বিষয় গুরুত্ব পায়। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে সামরিক শক্তির পরিবর্তে সংলাপ ও কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বানও বাংলাদেশের বক্তব্যে উঠে আসে। নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।

দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিয়েও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প ও উৎপাদন খাত সম্প্রসারণ, বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় উল্লেখ করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরা হয়। বৃক্ষরোপণ, জলবায়ু অভিযোজন এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও জাতিসংঘ সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর দেওয়া বক্তব্যে তিনি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে মতপার্থক্য কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি জাতিসংঘকে ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী বক্তব্যেও খলিলুর রহমান জাতিসংঘের কার্যকারিতা, আস্থা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কথা উল্লেখ করে এসব সংকটে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে আসে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয় আলোচনায় আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, শিক্ষা, পর্যটন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে উভয় পক্ষ আগ্রহ প্রকাশ করে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, ইরানে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের বিষয় আলোচনায় আসে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের তথ্যও এসেছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, বৈজ্ঞানিক, কারিগরি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা আরও নিয়মিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটি কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনা করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, টিকাদান ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়েও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় আলোচনায় এসেছে। গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন কর্মসূচিতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অধিবেশনের সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে বোয়িংয়ের ১১টি নতুন উড়োজাহাজের চুক্তিও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। বোয়িংয়ের নিজস্ব ঘোষণায় বলা হয়েছে, চুক্তিতে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ রয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের মোট অর্ডার ২৫টি উড়োজাহাজে দাঁড়িয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার মধ্যেই এসেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রশ্নটিও এবারের অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বসহ দীর্ঘদিনের সংস্কার দাবিগুলো নিয়ে জাতিসংঘে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

তবে এবার ভারতের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার দাবি ‘চূর্ণ’ করে গিয়েছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার ও স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের বিষয়ে নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরে আসছে। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বিস্তৃত সমঝোতা এবং জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এবারের অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে একযোগে যোগাযোগ বজায় রাখা। রোহিঙ্গা সংকট থেকে জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য থেকে বিমান খাত এবং জাতিসংঘ সংস্কার থেকে বৈশ্বিক শান্তি—বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ তার স্বার্থ ও অবস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে।

সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক উদ্যোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক কার্যক্রম গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি করেছে।

সূত্রঃ জাতিসংঘের সরকারি ওয়েবসাইট\ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়/ রয়টার্স

এমকে

আরো পড়ুন

যে কারণে বাংলাদেশে সেনা অভিযান হবে ভারতের জন্য দুঃস্বপ্ন

সাকিবকে নিয়ে জনমনে ক্ষোভ: সংবাদমাধ্যমের দায় কতটুকু?

অনলাইন ডেস্ক

আমি পদত্যাগ করব না: চাঁবিপ্রবি উপাচার্য নাছিম আখতার