গত আট মাসের বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশে অবস্থান করলেও যুক্তরাজ্যের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল থেকে বছরে ২০ হাজার ৬০০ পাউন্ড ভাতা (বাংলাদেশি টাকায় ৩৪ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি) গ্রহণ করছেন কাউন্সিলর সাবিনা খান। এ নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পূর্ব লন্ডনের মাইল এন্ড ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাবিনা খান বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেটে অবস্থান করছেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, যা লন্ডন থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূরে।
দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার পরও সাবিনা খান টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল থেকে তার পূর্ণ বাৎসরিক ভাতা ২০ হাজার ৬০০ পাউন্ড গ্রহণ করে যাচ্ছেন। আগামী মে মাসে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি কাউন্সিলর পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন বলে জানা গেছে। ততদিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার ইচ্ছা রয়েছে তার।
তার বাৎসরিক ভাতার মধ্যে রয়েছে—কাউন্সিলর হিসেবে ১১ হাজার ৮৯৮ পাউন্ড এবং কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব স্ক্রুটিনি লিড ফর রিসোর্সেস হিসেবে অতিরিক্ত ৮ হাজার ৭০২ পাউন্ড, যার আওতায় কাউন্সিলের ব্যয় ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করার দায়িত্ব থাকে।
গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশে আসার পর থেকে সাবিনা খান অধিকাংশ সময় দেশেই অবস্থান করছেন। মাঝে মধ্যে সশরীরে কিছু সভায় অংশ নিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনি অনলাইনে যুক্ত হয়েছেন, প্রতিনিধির মাধ্যমে উপস্থিতি দেখিয়েছেন বা একেবারেই অনুপস্থিত ছিলেন।
এক কাউন্সিল সূত্র অভিযোগ করে বলেন, “তিনি যখন অনলাইনে সভায় যোগ দেন, তখন পরিষ্কার বোঝা যায়—বাংলাদেশে নিজের বাসার বারান্দা থেকেই যুক্ত হচ্ছেন। এটা রীতিমতো কেলেঙ্কারি।” অন্য কাউন্সিল সদস্যরা এই পরিস্থিতিকে “অবিশ্বাস্য” ও “লজ্জাজনক” বলে মন্তব্য করেছেন।
আরেক কাউন্সিলর বলেন, “এটা সবার জন্যই অন্যায়। তিনি উচিত কাজটি করেননি। বাংলাদেশে বসে টাওয়ার হ্যামলেটসের কাজ করা সম্ভব নয়। আমি টাওয়ার হ্যামলেটসে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানি—সেখানে মানুষের কেসওয়ার্কে এমন সব হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ গল্প থাকে। এসব মানুষের সমস্যা সামনাসামনি বসে দেখা ও শোনা ছাড়া সম্ভব নয়, দূরে বসে অনলাইনে করলে সেই বাস্তবতা বোঝা যায় না।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট অঞ্চলের গোলাপগঞ্জ–বিয়ানীবাজার আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করেছিলেন সাবিনা খান।
গত নভেম্বরে তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি দাবি করেছিলেন, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকাকে তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যের আইনে কোনো কাউন্সিলরের বিদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া বেআইনি নয়। আমি দূর থেকে আমার দায়িত্ব পালন করেছি এবং প্রয়োজন হলে ফিরে এসেছি। তবে এখন আমি বাংলাদেশে জনসেবায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পদত্যাগ করেছি।”
তবে বাস্তবে কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ কখনোই তার পদত্যাগপত্র পায়নি। বরং ওই মাসের শেষ দিকে তাকে আবার কাউন্সিল সভায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
বাংলাদেশে পারিবারিক শিকড় থাকায়, লন্ডনের বহু বাসিন্দার মতো সাবিনা খানও বিএনপির প্রার্থী হতে বাংলাদেশে যান। তার সঙ্গে আরেক টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলর ওহিদ আহমেদও একই উদ্দেশ্যে প্রচারণায় অংশ নেন। তবে প্রাথমিক মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কেউই সফল হননি। ব্যর্থ হওয়ার পর ওহিদ আহমেদ লন্ডনে ফিরে স্বাভাবিক দায়িত্বে যোগ দিলেও সাবিনা খান বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন।
উল্লেখ্য, মেয়র লুতফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন অ্যাসপায়ার পার্টি নিয়ন্ত্রিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে সমালোচিত। ২০১৫ সালে নির্বাচনী দুর্নীতির দায়ে লুতফুর রহমান পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ হলেও নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর ২০২২ সালে তিনি আবার মেয়র নির্বাচিত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক টাউন হল বৈঠকে কাউন্সিল স্পষ্টভাবে জানায়, বিদেশে রাজনৈতিক পদে নির্বাচন করা “অগ্রহণযোগ্য”। তবে একই সঙ্গে দাবি করা হয়, সাবিনা খান এখনো তার এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি দায়বদ্ধ।
কাউন্সিলের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “মনিটরিং অফিসার সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদের জানিয়েছেন যে, অন্য দেশে রাজনৈতিক পদে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয় এবং কাউন্সিলরদের অবশ্যই নিজ নিজ এলাকার বাসিন্দা ও দায়িত্বের ওপর পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে। কাউন্সিলর খান অ্যাসপায়ার গ্রুপের হুইপকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তিনি তার দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
সূত্রঃ খবর জিবিএন নিউজের
এম.কে

