যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কথিত বিশেষ ইউনিট “ইউনিট ৭০০”-কে ঘিরে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ দাবি করেছে, ইরান বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে গড়ে তোলা চোরাচালান নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ছোট নৌকা ও বিকল্প রুটে যুক্তরাজ্যে সন্দেহভাজন গোপন অপারেটিভ পাঠাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুদস ফোর্সের লজিস্টিকস ও চোরাচালান শাখা হিসেবে পরিচিত ইউনিট ৭০০ অতীতে ইরান থেকে সিরিয়া, লেবাননসহ বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অস্ত্রের পাশাপাশি মাদক, অবৈধ অভিবাসী এবং প্রয়োজন হলে ইরানের হয়ে কাজ করতে পারে—এমন ব্যক্তিদেরও ইউরোপে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য ২০২৪ সালে ইউনিট ৭০০-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অভিযোগ ছিল, ইউনিটটি যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইরান থেকে তুরস্ক, সেখান থেকে ইতালি, ফ্রান্সের ক্যালে হয়ে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ডোভারে পৌঁছানোর একটি সুসংগঠিত রুট ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ হয়ে বিমানে করেও কিছু ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে তেহরানের দুই কর্মকর্তার উদ্ধৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে তারা দাবি করেন, ইরানের কাছে এমন লোক রয়েছে যারা ইতোমধ্যেই লন্ডনে অবস্থান করছে এবং প্রয়োজন হলে তাদের ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, “ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াই লন্ডনকে অনিরাপদ করা সম্ভব”, আরেকজন আরও এগিয়ে দাবি করেন, প্রয়োজন হলে এসব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিট পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু করা যেতে পারে।
এই হুমকি এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন আইআরজিসি প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বি-১ বোমারু বিমানকে গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য নিজেকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
প্রতিবেদনে ইউরোপমুখী মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত দুই পাচারকারীর বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের দাবি, পাচার নেটওয়ার্কের কিছু অংশে ইরান সরকারের প্রভাব রয়েছে এবং এসব রুট থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ তেহরানে পৌঁছায়। তারা আরও দাবি করেন, কম খরচে ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে কিছু মানুষকে ভবিষ্যতে বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ এসব দাবির বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। সাবেক ব্রিটিশ নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. লিনেট নাসবাখার মনে করেন, ইরানের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি গোপন এজেন্ট যুক্তরাজ্যে স্থাপন করা সহজ নয়। তার মতে, এখন পর্যন্ত যেসব কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো মূলত সীমিত পরিসরের প্রচারণামূলক কার্যক্রম।
অন্যদিকে ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা গবেষণা কেন্দ্রের উপপ্রধান ড. ক্রিস্টিয়ান গুস্তাফসন বলেন, ইরানের প্রধান উদ্দেশ্য যুক্তরাজ্যে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালানো নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে জনমনে চাপ সৃষ্টি করা এবং দুই মিত্র দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করা।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

