TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

মানবতাবিরোধী অপরাধে বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড

সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, নির্যাতন ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দামেস্কের আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা সিরিয়ার ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের দায়ে এটিই আসাদের বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক দণ্ডাদেশ।

আদালতের রায়ে আসাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। একই মামলায় সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দারা প্রদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে তার ভূমিকার বিষয়টি মামলায় গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে।

২০১১ সালে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে দেশব্যাপী সংঘাতে রূপ নেয়। পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপে সেই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত এবং কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

আসাদ ২০০০ সালে তার বাবা হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী বাহিনীর আকস্মিক অভিযানে তার সরকারের পতন ঘটে। এরপর তিনি সিরিয়া ছেড়ে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় চলে যান। বর্তমানে তিনি রাশিয়াতেই অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ফলে আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আসাদকে কীভাবে সিরিয়ায় ফিরিয়ে এনে এই সাজা কার্যকর করা হবে। তিনি রাশিয়ায় অবস্থান করায় তাকে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

আসাদের শাসনামলে সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বিচারে আটক, নির্যাতন, হত্যা এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তেও আসাদ সরকারের দমন-পীড়ন ও আটককেন্দ্রে নির্যাতনের বিষয়ে গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে।

বিশেষ করে ২০১১ সালে দারা শহরে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের ঘটনা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অন্যতম সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। আতেফ নাজিব তখন দারা অঞ্চলের রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধান ছিলেন। তাকে আন্দোলন দমনে কঠোর ভূমিকার জন্য দায়ী করা হয়েছে। আদালতের রায়ে হত্যা, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর মতো গুরুতর অপরাধের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুধু দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করেনি; এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সংঘাতের সুযোগে আল-কায়েদা ও পরবর্তী সময়ে ইসলামিক স্টেটের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটে। এর ফলে সিরিয়া আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। সারিন ও ক্লোরিনসহ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ সিরিয়ার যুদ্ধের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।

আসাদের পতনের পর তার পরিবারের কয়েক দশকের শাসনের অবসান ঘটে। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেছে। আজকের রায় সেই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে মৃত্যুদণ্ডের এই রায় কার্যকর করতে হলে আসাদকে রাশিয়া থেকে সিরিয়ায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই আদালতের রায় ঘোষণার পর এখন সিরিয়ার নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও আইনগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাবেক প্রেসিডেন্টকে তাদের হেফাজতে নেওয়া।

অন্যদিকে, আসাদের বিরুদ্ধে চলা বিচারপ্রক্রিয়া সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে নিহত ও নির্যাতিত মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কি না—তা নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে রায় বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি অনেকাংশেই নির্ভর করবে রাশিয়ার অবস্থান এবং আসাদকে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে মস্কোর সিদ্ধান্তের ওপর।

সূত্রঃ মিরর

এম.কে

আরো পড়ুন

জন্মহার বাড়াতে পিতৃত্ব-মাতৃত্বকালীন ভাতা বাড়াচ্ছে ফ্রান্স

ইরানের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেয়নি পোল্যান্ড

মার্কিন পণ্যে পাল্টা ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা কানাডার, হুমকি মেক্সিকোরও