আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের নরফোকের থেটফোর্ড শহরে টানা তিন রাত ধরে বিক্ষোভ, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা কয়েকটি বাড়িতে বিক্ষোভকারীরা ঢোকার চেষ্টা, জানালা ভাঙচুর ও বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একই সময়ে পুলিশের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার রাতে প্রায় দুই শতাধিক মানুষের একটি ভিড় লক্ষ্যবস্তু হওয়া একটি আবাসিক সড়কে জড়ো হয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গেলে এক কর্মকর্তা ইটের আঘাতে আহত হন। অন্যদিকে এক নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে গুরুতরভাবে কামড়ে দেওয়া হয় বলে নরফোক পুলিশ জানিয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত বিশৃঙ্খলার ঘটনায় শুক্রবার পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকটি বাড়ি থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, যেসব বাড়িকে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলোর কিছু এখন খালি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শহরের সামাজিক পরিবেশ ও সম্পত্তির বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
থেটফোর্ডের সাবেক কাউন্সিলর জেনি হলিস বলেন, স্থানীয় মানুষের প্রধান উদ্বেগ হলো নিরাপত্তা এবং শিশুদের সুরক্ষা। তাঁর মতে, আশ্রয়প্রার্থীদের কোথায় রাখা হচ্ছে সে বিষয়ে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যথেষ্ট পরামর্শ করা হয়নি। তিনি জানান, লক্ষ্যবস্তু হওয়া একটি বাড়ির কাছেই বিদ্যালয় ও শিশুদের দেখাশোনার একটি কেন্দ্র রয়েছে।
জেনি হলিস বলেন, থেটফোর্ড ছোট একটি শহর, যেখানে অধিকাংশ মানুষ একে অপরকে চেনেন। এমন এলাকায় স্থানীয়দের কাছে অপরিচিত তরুণদের রাতের অন্ধকারে এনে বসবাসের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
তবে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সহিংসতার ফলে বর্ণবিদ্বেষ ও অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা এক নারী, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে থেটফোর্ডে বসবাস করছেন, জানান, সাম্প্রতিক ঘটনার আগে তিনি কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি। কিন্তু এবার তাঁর সঙ্গীকে ‘অভিবাসী’ বলে অপমান করে চিৎকার করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম নরফোকের সংসদ সদস্য টেরি জার্মি পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে স্বীকার করলেও সাম্প্রতিক ঘটনাকে সরাসরি অপরাধ, উচ্ছৃঙ্খল জনতার তাণ্ডব এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
টেরি জার্মির অভিযোগ, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের বিষয়ে স্থানীয় জনগণ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের যোগাযোগ যথেষ্ট ছিল না। এর ফলে নানা ধরনের গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম আয়ের শ্রমজীবী এলাকাগুলোতেই কেন আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের জন্য বাড়ি বেছে নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য একাধিক ব্যক্তির বসবাসের উপযোগী বাড়ি ব্যবহারের সিদ্ধান্তও স্থানীয়দের সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা এমন কয়েকটি বাড়ির তালিকা তৈরি করে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যেগুলো আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসব আবাসনের ব্যবস্থাপনায় থাকা সেরকো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে। কোনো স্থানীয় এলাকায় কতজন আশ্রয়প্রার্থীকে রাখা হবে, সে বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের চাহিদার ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাদের নির্দেশ দেয় বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র ডানপন্থী কয়েকজন সক্রিয় ব্যক্তির মাধ্যমে থেটফোর্ডের বিক্ষোভ ও উত্তেজনার বিভিন্ন দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে স্থানীয় উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একটি প্রচারিত ভিডিওতে একজন ব্যক্তিকে ভিড়কে একটি নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে যেতে নির্দেশ দিতে দেখা যায়। সেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য জানিয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের ক্ষেত্রে বড় আকারের কেন্দ্র ব্যবহারের পরিকল্পনা তাদের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দপ্তরের হিসাবে, গত এক বছরে হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ৩৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার আশ্রয়প্রার্থী হোটেলে অবস্থান করলেও সেই সর্বোচ্চ সংখ্যার তুলনায় বর্তমানে সংখ্যা ৬৩ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে থেটফোর্ডে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় একটি সাবেক বিমানঘাঁটিতে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী রাখার পরিকল্পনা। শহরের কাছাকাছি আরএএফ বার্নহ্যাম বিমানঘাঁটিতে ৩ হাজার ৭৫০ জন অভিবাসীকে রাখার পরিকল্পনার কথা জুন মাসে প্রকাশ করা হয়। এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও নিয়মিত বিক্ষোভ হয়ে আসছে।
নরফোক কাউন্টি কাউন্সিলের রিফর্ম ইউকের সদস্য স্কট হাসি শুক্রবার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন তাদের শহরকে অবৈধ অভিবাসীদের আবাসনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন যে থেটফোর্ডে আরও কিছু বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হতে পারে। এতে স্থানীয় উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও আশ্রয়বিষয়ক মন্ত্রী আনা টারলি বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার মানুষের রয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ সহিংসতায় পরিণত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষায়, কোনো মানুষকে নিজের বাড়িতে হয়রানি, ভয় দেখানো বা হুমকির মুখে পড়তে হওয়া উচিত নয়। একইভাবে জরুরি সেবাকর্মী ও পুলিশের ওপর হামলাও মেনে নেওয়া যায় না।
থেটফোর্ডের সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে এখন মূল উদ্বেগ হলো—আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নিয়ে স্থানীয় মানুষের প্রকৃত উদ্বেগ কতটা কার্যকরভাবে সমাধান করা হবে এবং একই সঙ্গে সহিংসতা, বর্ণবিদ্বেষ ও উগ্র অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন পক্ষের মতে, কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ যোগাযোগ ও গুজব মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

