TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় আসা আশ্রয়প্রার্থীদের কারাদণ্ড বাড়াতে নতুন আইন

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিবাসন আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অবৈধ আগমন’ অপরাধে অন্তত এক হাজার ৯৯ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আশ্রয়প্রার্থী ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, নতুন আইন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আশ্রয়প্রার্থীদের ক্রমেই অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

২০২২ সালে কার্যকর হওয়া জাতীয়তা ও সীমান্ত আইনের মাধ্যমে ‘অবৈধ আগমন’ নামে নতুন অপরাধ যুক্ত করা হয়। এরপর থেকে অনুমতি ছাড়া যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা শুরু হয়। তবে অনিয়মিতভাবে আগত সবাইকে নয়, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে বেছে নিয়ে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তথ্য অনুযায়ী, দোষী সাব্যস্তদের মধ্যে ৬২৮ জন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৩২ জনকে নৌকার চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অনেকের বিরুদ্ধে মানবপাচারে সহায়তার অভিযোগও আনা হলেও পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অভিযোগ পরে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, যাদের নৌকার চালক হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই পেশাদার মানবপাচারকারী নন। অনেকেই কম ভাড়ায় যাত্রার সুযোগ পাওয়ার জন্য নৌকা চালিয়েছেন। কেউ কেউ আবার পাচারকারীদের হুমকি কিংবা অস্ত্রের মুখে বাধ্য হয়ে নৌকার দায়িত্ব নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে মূল চালক অসুস্থ বা ক্লান্ত হয়ে পড়লে অন্য যাত্রীরা পালাক্রমে নৌকা চালিয়েছেন।

তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুদান ও দক্ষিণ সুদানের নাগরিকরা এ ধরনের মামলায় তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যায় অভিযুক্ত হচ্ছেন। এছাড়া যাদের আগে যুক্তরাজ্যের ভিসার আবেদন বা অন্য কোনো অভিবাসন-সংক্রান্ত রেকর্ড ছিল, তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আশ্রয়প্রার্থীদের যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর আশ্রয়ের আবেদন করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের কেন্ট অঞ্চলের থানায় নিয়ে গিয়ে সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয়। অধিকাংশ অভিযুক্ত আইনজীবীর পরামর্শে দোষ স্বীকার করেন, কারণ এতে কারাদণ্ড কিছুটা কম হওয়ার সুযোগ থাকে। নৌকার চালকদের অনেকেই আট থেকে নয় মাসের কারাদণ্ড পেলেও, পূর্ববর্তী অভিবাসন ইতিহাস থাকলে অনেকের সাজা এক বছর বা তারও বেশি হয়েছে।

এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয় ও অভিবাসন আইন কার্যকর হওয়ার পর ‘সমুদ্রে মানুষের জীবন বিপন্ন করা’ নামে নতুন একটি অপরাধ যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে ছোট নৌকার চালকদের আরও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই নতুন আইনের অধীনে প্রথম সাজা হয় ২০২৬ সালের জুনে। আফগানিস্তানের মোহাম্মদ তাজিককে ২৭ মাস এবং সুদানের আলনুর আলীকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুজনই যুক্তরাজ্যে পৌঁছে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং আদালতে দোষ স্বীকার করেছিলেন। অভিযোগে বলা হয়, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে নৌকা চালানোর মাধ্যমে তারা যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিলেন। তবে আদালতেও স্বীকার করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে যাত্রা আয়োজন বা মানবপাচার চক্র পরিচালনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, এ ধরনের বিচার ইংলিশ চ্যানেল পারাপার নিরুৎসাহিত করে—এমন কোনো গবেষণা বা বাস্তব প্রমাণ তার জানা নেই। এরপরও তিনি কঠোর সাজা প্রদান করেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সীমান্তে কড়াকড়ি, নৌকার ইঞ্জিন জব্দ এবং উপকূলে কঠোর অভিযান চালানোর ফলে আশ্রয়প্রার্থীরা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের মতে, এতে প্রাণহানির ঝুঁকি কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে।

সংগঠনগুলো আরও জানিয়েছে, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘সমুদ্রে মানুষের জীবন বিপন্ন করার’ অভিযোগ আনা হয়েছিল, পরে সরকারি বয়স নির্ধারণে তার বয়স মাত্র ১৬ বছর বলে নিশ্চিত হয়। তারপরও তার বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাওয়ায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বর্তমানে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী ও মানবাধিকার সংগঠন এসব মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা, আশ্রয়-সংক্রান্ত সহযোগিতা এবং সামাজিক পুনর্বাসনে কাজ করছে। একই সঙ্গে তারা আশ্রয়প্রার্থীদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষা নীতির আলোকে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে।

সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

রেকর্ড বন্যার পর যুক্তরাজ্যে তীব্র ঠান্ডাঃ তুষারপাত–বরফে নতুন ঝুঁকি

নিউজ ডেস্ক

ক্রিসমাসের আগেই ফিরছে লন্ডনের ওভারগ্রাউন্ড নাইট সার্ভিস

ব্রিটেনে গ্রিন পার্টির উত্থান, প্রচলিত দুই দলে ভাঙনে নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব