যুক্তরাজ্যে মানবাধিকার আইনের সুযোগ নিয়ে বহিষ্কার এড়ানোর চেষ্টা বন্ধ করতে অভিবাসন আইনে নতুন কঠোর সংস্কারের প্রস্তাব এনেছে সরকার। সন্তানের সঙ্গে প্রকৃত পারিবারিক সম্পর্কের দাবি এবং শেষ মুহূর্তে আশ্রয়ের আবেদন করার বিষয়গুলোতে আরও কঠোর যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে অভিবাসন ও আশ্রয় বিলের দুটি সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১২ অক্টোবর প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়েছে, পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা যথাযথ কারণ ছাড়াই শেষ মুহূর্তে আশ্রয়ের আবেদন করার মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার প্রবণতা ঠেকাতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যেসব বিদেশি নাগরিকের যুক্তরাজ্যে থাকার আইনগত অধিকার নেই, তাদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া দ্রুত করার লক্ষ্যেও এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের দাবি জানালে আদালতকে বিবেচনা করতে হবে, ওই অভিভাবক কত দিন ধরে এবং কত ঘন ঘন সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। অর্থাৎ, শুধু সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার দাবি নয়, বাস্তবে সেই সম্পর্ক কতটা বজায় রয়েছে, তা-ও মূল্যায়নের বিষয় হবে।
এর আগে অভিবাসন ও আশ্রয় বিলে ‘পারিবারিক জীবন’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে সাধারণত একই বাড়িতে বসবাসকারী নিকট পরিবারের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নতুন সংশোধনীর লক্ষ্য হলো, বহিষ্কার ঠেকাতে মানবাধিকার আইনের আওতায় আবেদন করার ঠিক আগে কেউ যেন পরিবারের বাড়িতে ফিরে গিয়ে পারিবারিক সম্পর্কের দাবি জোরালো করার সুযোগ না পান।
যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার আইনের আট নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের প্রতি সম্মানের অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। অভিবাসনসংক্রান্ত কিছু মামলায় এই অধিকার বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সরকার বলছে, এই আইনি সুরক্ষার অপব্যবহার বন্ধ করতে বিদ্যমান ব্যবস্থায় আরও কঠোরতা আনা প্রয়োজন।
শেষ মুহূর্তে আশ্রয়ের আবেদন নিয়েও নতুন বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। যথাযথ কারণ ছাড়া দেরিতে আবেদন করলে বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেষ মুহূর্তে সামনে আনলে তা আবেদনকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদেরও আবেদন বা প্রমাণ উপস্থাপনের সময় বিবেচনায় নিতে হবে।
বিলটিতে দেরিতে করা আশ্রয়-সংক্রান্ত দাবিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের মতে, কেউ তথ্য গোপন করে বা বহিষ্কারের ঠিক আগে নতুন দাবি উত্থাপন করে যেন বৈধ বহিষ্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, “ব্রিটিশ জনগণের অবশ্যই বিশ্বাস থাকতে হবে যে তাদের অভিবাসন ব্যবস্থা নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত এবং অপব্যবহারের সুযোগমুক্ত।”
তিনি আরও বলেন, এসব সংস্কার অভিবাসন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করবে, অপব্যবহার ঠেকাবে এবং যাদের যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার নেই, তাদের দ্রুত বহিষ্কার নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। আশ্রয়-সংক্রান্ত ব্যয় কমানো এবং বহিষ্কারের সংখ্যা বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের সঙ্গেও এই পদক্ষেপ যুক্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জুলাই মাসে বিলটি হাউস অব কমন্সে দ্বিতীয় পাঠে ১৭৪ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়। এতে করদাতাদের অর্থে আবাসন ও অন্যান্য সহায়তা পাওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য থাকলে সেই ব্যয়ের একটি অংশ পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নির্ধারিত একটি সীমার বেশি আর্থিক সামর্থ্য থাকা যোগ্য প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া আপিল প্রক্রিয়া দ্রুত ও ন্যায্য করতে একটি স্বাধীন অভিবাসন আপিল কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। আপিলের চাহিদা অনুযায়ী এই কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম বাড়ানো যাবে। আপিলে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত।
বিলে একক আপিলব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে নতুন দাবি উত্থাপন করে অভিবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ কমে। পাশাপাশি শরণার্থী মর্যাদা ও মানবিক সুরক্ষাকে একত্র করে সুরক্ষার দাবির একটি অভিন্ন সংজ্ঞা প্রবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আবেদন যাচাই ও আপিলের প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, বিলটি আগামী সপ্তাহে সংসদে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি ধারা পর্যালোচনার পর্যায়ে প্রবেশ করবে। প্রস্তাবগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে; তাই এগুলোকে ইতোমধ্যে কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
সূত্রঃ ইউকে.গভ
এমকে

