TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি ও আ.লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে পোশাক খাতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং পুলিশের সাবেক দুই অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নাম উঠে এসেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করেছিল একটি প্রভাবশালী চক্র। এ জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে লোক সংগ্রহ, অর্থায়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩ নভেম্বর কালশী-পূরবী মোড়ে ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানার সামনে ডিএমপির কনস্টেবল সালমানের ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেফতার ১৯ জনের দেওয়া তথ্য থেকে এই পরিকল্পনার বিষয়টি সামনে আসে।

ডিবির তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, তার ভাগিনা আলিফ মোল্লা এবং পুলিশের সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক। এ ছাড়া মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আক্তার রনি এবং ওই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, এসব ব্যক্তি আন্দোলনে অর্থায়ন ও নেপথ্যে ইন্ধন জুগিয়েছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের ঢাল বানিয়ে পুরো তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার সুপরিকল্পিত ছক ছিল। গ্রেফতার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শীর্ষ পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কালশীর শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড কারখানাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এস এম মান্নান কচির মালিকানায় ছিল। পরে কাগজে-কলমে তিনি সরে দাঁড়ালেও কারখানাটির নিয়ন্ত্রণ পাঁচ সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের হাতে যায় বলে ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে। এই সিন্ডিকেটে সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক ছাড়াও রয়েছেন আতিকুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও মুশতাক আহমেদ।

গ্রেফতার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে অন্তত ১৬টি হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে ডিবি। ‘চেতনা মুক্তিযুদ্ধ’, ‘শেখ হাসিনা রিজার্ভ ফোর্স’, ‘ঢাকা জেলা গেরিলা ৭১’, ‘হাসু আপার বাংলা’, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গেরিলা’সহ বিভিন্ন নামে এসব গ্রুপ পরিচালিত হতো বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তাদের দাবি, এসব গ্রুপের মাধ্যমে নাশকতার পরিকল্পনা, লোকজনকে নির্দেশনা দেওয়া এবং বিভিন্ন স্থানের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান করা হতো। কিছু বার্তা মুছে ফেলা হলেও ডিবির ফরেনসিক দল অডিও ও ছবি উদ্ধার করেছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, মিছিল কিংবা গাড়িতে আগুন দেওয়ার ছবি ও ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলে সেগুলো দেখে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগিনা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা অর্থ পাঠাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১ নভেম্বর পল্লবীতে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ভিডিও ধারণ করে শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের যুবলীগ নেতা মুয়াজ্জেম শাহরিয়ার নেওয়াজের বিরুদ্ধে।

পোশাকশ্রমিকদের স্বাভাবিক দাবি-দাওয়াকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে পঞ্চগড়, কক্সবাজার ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে লোক এনে ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের। পঞ্চগড় কলেজ ছাত্রলীগের নেতা নাহিদ হাসানও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার রনির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজীপুরে দুজন পোশাকশ্রমিকের মরদেহ পাওয়া গেছে বলে ভুয়া তথ্য প্রচারের অভিযোগ উঠেছে। ডিবির দাবি, এই গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে তাদের রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

গত ৩ নভেম্বর কালশী মোড়ে ডিএমপির কনস্টেবল সালমানকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করা হয়। বিভিন্ন স্থানের চার থেকে পাঁচটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে আটজনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি।

তারা হলেন আশিক জুলহাস, আরাফাত ইসলাম জিসান, মো. রশিদ আলী, সোহেল রানা, মিলন বাবু, আনারুল ইসলাম, মো. রানা ও মনছুর আলী। এর আগে ১ নভেম্বর গ্রেফতার হওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তাদের হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য ঘেঁটে অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের হাতে আসা একটি অডিও বার্তায় গ্রেফতার নাহিদ হাসানকে অন্যদের নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দিতে শোনা যায়। ওই বার্তায় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা সবাই ১২ নম্বর ইলিয়াস মোল্লার মার্কেটের সামনে আসেন… এখানে পুলিশ একদিকে চলে গেছে, আমাদের সুযোগ নিতে হবে… আজকের দিনটা করতে পারলে আমাদের নাম হবে।’

ডিবির দাবি, এসব অডিও বার্তা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে সহিংসতার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা শনাক্ত করা হচ্ছে। অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর

এমকে

আরো পড়ুন

রাজনীতিতে যোগ দেওয়া কিংবা দল গঠনের কোনো ইচ্ছা নেইঃ প্রধান উপদেষ্টা

চলন্ত ট্রেনের ছাদে টিকটক, ছিটকে পড়ে দুজনের মৃত্যু

চলছে সংসদ ভবনে উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষ তৈরির প্রস্তুতি