10.5 C
London
October 20, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

‘স্পঞ্জ সিটি’ অতিবৃষ্টি ও খরা মোকাবিলায়ঃ বৃষ্টির পানিকে সম্পদে রূপান্তর করছে ইউরোপ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরগুলোকে এমনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নর্দমায় চলে যাওয়ার পরিবর্তে মাটিতে শোষিত হয়, জলাধারে জমা থাকে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়। এ লক্ষ্যেই গুরুত্ব পাচ্ছে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বা পানি শোষণকারী নগর মডেল। ইউরোপীয় ইউনিয়নও প্রকৃতিভিত্তিক এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।

প্রচলিত নগর পরিকল্পনায় রাস্তা, ফুটপাত ও ভবনের অধিকাংশ জায়গা কংক্রিট কিংবা অন্যান্য শক্ত উপকরণে ঢেকে দেওয়া হয়। ফলে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি নালা-নর্দমায় জমে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটও বাড়তে পারে।

স্পঞ্জ সিটি মডেলে শহরকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে একটি স্পঞ্জের মতো বৃষ্টির পানি শোষণ করে ধরে রাখা যায়। এ পদ্ধতিতে পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ পায়, জলাধারে জমা থাকে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে ব্যবহার করা যায়। এর ফলে অতিবৃষ্টির সময় পানি জমার চাপ কমানোর পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এই মডেলে পানি শোষণকারী রাস্তা ও ফুটপাত, সবুজ ছাদ, ছাদবাগান, জলাভূমি, বৃষ্টিবাগান, জলধারণকারী পুকুর এবং বিশেষভাবে নকশা করা পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। ভবনের ছাদে গাছপালা ও মাটির স্তর বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। প্রবেশ্য রাস্তা ও ফুটপাতের মধ্য দিয়ে পানি মাটিতে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, জলাধার ও জলাভূমি অতিরিক্ত পানি সাময়িকভাবে জমা রাখে। সংরক্ষিত পানি পরে সেচ ও অন্যান্য উপযোগী কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

সুইডেনের মালমো শহরের অগাস্টেনবার্গ এলাকায় স্পঞ্জ সিটি মডেলের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। সেখানে বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার জন্য সবুজ ছাদ, জলাভূমি, পুকুর ও খালের নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ভারী বৃষ্টির পানি দ্রুত নর্দমায় প্রবেশের চাপ কমানো এবং বিকল্প পথে পানি ধরে রাখা। ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় ঝড়ের সময় এলাকাটিতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এই ব্যবস্থা সহায়তা করেছে।

জার্মানির বার্লিনেও সবুজ ছাদ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সবুজ অবকাঠামোর মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হামবুর্গেও ভবন ও নগর অবকাঠামোর নকশায় সবুজ এলাকা এবং বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জায়গার সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভবনের ছাদ, খোলা জায়গা ও পরিকল্পিত জলাধার ব্যবহার করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করা যায়।

নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহরের বেনথেমপ্লেইন জলচত্বরও এ ধরনের পরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। স্বাভাবিক সময়ে জায়গাটি খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। ভারী বৃষ্টির সময় এর জলাধারগুলো প্রায় ১৭ লাখ লিটার পানি সাময়িকভাবে ধরে রাখতে পারে। অর্থাৎ, একই অবকাঠামো দৈনন্দিন নাগরিক সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনাতেও কাজে লাগে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পানি সহনশীলতা কৌশলে বন্যা, খরা ও পানির সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ‘স্পঞ্জ ফ্যাসিলিটি’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে পানি ধরে রাখা ও সংরক্ষণের প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর ইউরোপীয় কমিশন ‘ওয়াটার রেজিলিয়েন্স ইনভেস্টমেন্ট অ্যাক্সিলারেটর’ উদ্যোগের কথা জানায়। এর আওতায় প্রাকৃতিক উপায়ে পানি সংরক্ষণ, বিশুদ্ধ পানি এবং পানির দক্ষ ব্যবহারসংক্রান্ত ২০টি উদ্ভাবনী পরীক্ষামূলক প্রকল্পে সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে স্পঞ্জ সিটি সব পরিস্থিতিতে বন্যা ও খরার সম্পূর্ণ সমাধান দিতে পারে না। দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টি হলে মাটি পানিতে সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। জলাধারগুলোর ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে অতিরিক্ত পানি জমার ঝুঁকিও থাকে। এ কারণে স্পঞ্জ সিটির পাশাপাশি প্রচলিত নালা-নর্দমা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, বড় জলাধার এবং বন্যার পানি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিকল্প পথ বজায় রাখা জরুরি।

পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবও এ মডেল বাস্তবায়নের একটি বড় বাধা। ভবন, সড়ক এবং মাটির নিচে থাকা অবকাঠামোর কারণে নতুন জলাধার বা পানি শোষণকারী এলাকা তৈরি করা কঠিন হতে পারে। তাই ছোট পরিসরে সবুজ ছাদ, বৃষ্টিবাগান, পানি প্রবেশ্য ফুটপাত এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট যখন নগরজীবনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে, তখন স্পঞ্জ সিটি মডেল বৃষ্টির পানিকে অপচয় না করে সম্পদে রূপান্তরের সম্ভাবনাময় পথ দেখাচ্ছে। ইউরোপের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকৃতিভিত্তিক অবকাঠামো, কার্যকর নগর পরিকল্পনা এবং প্রচলিত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ভবিষ্যতের শহরগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তোলা সম্ভব।

সূত্রঃ ইউরোনিউজ

এমকে

আরো পড়ুন

ইরান ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে’ পড়েছেঃ ল্যাভরভ

ইসরাইলকে চ্যালেঞ্জ জানাবে সৌদি-তুরস্ক জোট

ইরানে হামলা বাড়িয়ে নতুন ঝুঁকিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প