যুক্তরাজ্য সৌদি আরবকে হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করতে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার পর এই প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তার অনুমোদন দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং মঙ্গলবার এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মোতায়েন করা যুদ্ধবিমানগুলো প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করবে। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালানো এই অভিযানের উদ্দেশ্য নয়; বরং সৌদি শহর, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে আকাশপথের হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
সম্প্রতি সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথিদের হামলার পর যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্ত এসেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, গত সপ্তাহে দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে হুথিদের হামলায় ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০৮ জন আহত হন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক সংবাদ সম্মেলনে আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া একটি স্থিরচিত্রও দেখানো হয়। সৌদি পক্ষের দাবি, গত ৭ অক্টোবর দেশটির আসির প্রদেশের এই বিমানবন্দরে হুথিদের হামলার দৃশ্য এতে উঠে এসেছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুথিদের দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। সৌদি আরব ওই সরকারকে সমর্থন করে। অন্যদিকে, হুথি গোষ্ঠী ইরানের সমর্থনপুষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইয়েমেনের মধ্যাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে একটি সামরিক প্রশিক্ষণশিবিরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭০ জনের বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, আতাক শহরের কাছে অবস্থিত আল-আলাম শিবিরে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। শিবিরটি নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশে নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্রও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার কথা উল্লেখ করে গোষ্ঠীটির অভিযান অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের আরও গভীরে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।
এদিকে সৌদি আরবের ওপর হামলার জবাবে ইয়েমেনে বিমান ও কামান হামলা চালাচ্ছে সৌদি পক্ষ। হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি বিমান ও কামান হামলায় অন্তত ১৪১ জন নিহত এবং ৩৯৫ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইয়েমেন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৬ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে চলমান সংঘাতে অন্তত ১ হাজার ২৮২ জন নিহত হয়েছেন। এসব হতাহতের সংখ্যা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দেওয়া হিসাব; স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পাশাপাশি সৌদি আরবের অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পরিবহনে সহায়তার জন্য সামরিক উপদেষ্টা এবং আরএএফের এ৪০০এম পরিবহন বিমানও পাঠাবে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে সহায়তার জন্য আকাশে জ্বালানি সরবরাহের কার্যক্রমের মেয়াদ আরও ৯০ দিন বাড়ানো হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, রিয়াদ বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ঘটনা থেকে বোঝা যায়, হুথিরা আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ কারণেই সৌদি আরবকে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্ট্রিটিং আরও বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সহিংসতা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের ওপর। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্রিটিশ সহযোগিতা আরও জোরদার হচ্ছে। তবে অভিযানকে প্রতিরক্ষামূলক রাখার বিষয়ে লন্ডনের ঘোষণার অর্থ হলো, ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধবিমানগুলো হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণের জন্য নয়, বরং সৌদি আরবকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষার কাজে ব্যবহৃত হবে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এমকে

