ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আজিত ডোভাল ১৭ সেপ্টেম্বর গোপনে ঢাকায় এসেছিলেন—ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে এমন দাবি প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সময়ের সঙ্গে এসব প্রতিবেদনে ডোভালের কথিত সফর নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য যোগ হয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, তিনি একটি গালফস্ট্রিম উড়োজাহাজে তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে গোপনে অবতরণ করেন, প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঢাকায় অবস্থান করেন এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তবে এসব দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সরকারি সফরসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি সামনে এসেছে। ভারতীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ডোভালের সঙ্গে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, সেনাপ্রধান ১৬ সেপ্টেম্বর জাপানের উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং ২০ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এশিয়ান গেমস উপলক্ষে চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে যান। সেখানে তিনি বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশ নেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১৯ সেপ্টেম্বর এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন।
আইএসপিআর পরে জানায়, জেনারেল ওয়াকার বাংলাদেশি অ্যাথলেটদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা দেখেন এবং অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার প্রেসিডেন্ট শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন।
ডোভালের কথিত সফর নিয়ে প্রথম উল্লেখযোগ্য ভারতীয় প্রতিবেদন প্রকাশ করে রেডিফ ১৯ সেপ্টেম্বর। ‘হোয়াই আজিত ডোভাল ভিজিটেড ঢাকা অন থার্সডে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর ডোভাল ঢাকায় ছিলেন এবং দিনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময় বাংলাদেশে অবস্থান করেন। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ডোভালের সফর হয়ে থাকতে পারে।
তবে ওই প্রতিবেদনে ডোভাল কোন বিমানে বাংলাদেশে এসেছিলেন, কোথায় অবতরণ করেছিলেন কিংবা বাংলাদেশের কোন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
১ অক্টোবর দ্য কাশ্মীর টাইমস প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ডোভালের কথিত সফর সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট দাবি করা হয়। ‘দ্য ডোভাল ডকট্রিন ল্যান্ডস ইন ঢাকা’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে একটি গালফস্ট্রিম উড়োজাহাজে করে ডোভাল তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে গোপনে অবতরণ করেন। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, তিনি প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঢাকায় ছিলেন।
ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ডোভাল বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। কায়সার রশীদকে নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে ভারতের গবেষণা ও বিশ্লেষণ শাখা—র-এর আয়োজিত একটি দক্ষিণ এশীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর দাবিও করা হয়।
তবে এসব দাবির সমর্থনে কোনো সরকারি নথি বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে ১৭ সেপ্টেম্বর বৈঠকের দাবিটি তার সরকারি সফরসূচির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একাধিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশীদ চৌধুরীও ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বাইরে ছিলেন এবং একটি উপসাগরীয় দেশে সফর করছিলেন। তবে তার ওই সফরের কোনো সরকারি ভ্রমণ নথি ডেইলি ওয়াদা স্বাধীনভাবে সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে বিষয়টিকে নিশ্চিত তথ্যের পরিবর্তে সূত্রনির্ভর দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কায়সার রশীদের বিদেশে অবস্থানের তথ্যটি সত্য হলে, দ্য কাশ্মীর টাইমসের প্রতিবেদনে ডোভালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে উল্লেখ করা বাংলাদেশের দুই শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার কেউই ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ছিলেন না—এমন প্রশ্ন তৈরি হয়।
ডোভালের কথিত সফর সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারও কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান বলেন, ডোভালের বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ডোভাল বাংলাদেশে এলে সরকার অবশ্যই তা জানত এবং সেটি একটি সরকারি সফর হতো।
৩০ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকেও ডোভালের কথিত সফর সম্পর্কে নিশ্চিত করতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দ্যাট ওয়েন্ট ওভার মাই হেড, ব্রাদার।”
তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা পর্যায়ে যোগাযোগ যে হয়েছে, সেটি আলাদা বিষয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার অনুরোধ, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে।
এর পাশাপাশি দুই দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। ডিজিএফআই প্রধান কায়সার রশীদ দায়িত্ব নেওয়ার পর নয়াদিল্লি সফর করেন এবং ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধানও আগস্টে ঢাকায় সফর করেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সফরসূচি ঘোষণা করেনি। ১৭ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। পরে একই দিনে মোদিও তার জবাব দেন।
ডোভালের কথিত সফর নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে এই বার্তা বিনিময়কে দুই দেশের সম্ভাব্য সম্পর্কোন্নয়নের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। দ্য কাশ্মীর টাইমসের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে ভারতের সম্ভাব্য নিরাপত্তা হিসাব নিয়েও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে এসব অংশ প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ; এগুলোকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো নথি সেখানে উপস্থাপন করা হয়নি।
এর মধ্যে ১ অক্টোবর বাংলাদেশে এক ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মামলা হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের ৪৪ বছর বয়সী রাবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংবেদনশীল তথ্য হস্তান্তরের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ডিবির পরিদর্শক মেজবা উদ্দিন উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলাটি করেন। পরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহ তদন্তের জন্য রাবিউলকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠান। তদন্তকারীদের দাবি, রাবিউল ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
পুলিশের অভিযোগ, গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে রাবিউল পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করতেন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে গুপ্তচরবৃত্তির আড়াল হিসেবে ব্যবহার করতেন। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও সংরক্ষিত এলাকার ছবি এবং সংবেদনশীল সরকারি নথি ও তথ্য বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানোর চেষ্টার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।
তবে রাবিউল ইসলাম ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতে আগের এক শুনানিতে তিনি দাবি করেন, পোশাক ব্যবসার কারণে নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করেন।
ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাবিউলের বিরুদ্ধে মামলার সঙ্গে ডোভালের কথিত সফরের সরাসরি কোনো প্রমাণিত যোগসূত্র নেই। তবে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কয়েকজন গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে, ডোভাল যদি সত্যিই ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসে বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে থাকেন, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই একজন ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে এমন একটি গুপ্তচরবৃত্তির মামলা হওয়া দুই ঘটনার সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে এটিও ডোভাল বাংলাদেশে আসেননি—এমন প্রমাণ নয়। একইভাবে তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে তার কথিত অবতরণ বা বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবিও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায়নি।
ফলে ১৭ সেপ্টেম্বর আজিত ডোভালের কথিত গোপন ঢাকা সফর নিয়ে একদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমে বিস্তারিত দাবি রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সফরসূচি ও সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে সেই দাবির গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে। ডোভাল সত্যিই ঢাকায় এসেছিলেন কি না, এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য নথি এখনো সামনে আসেনি।
সূত্রঃ ডেইলি ওয়াদা
এমকে

