যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় করে অবৈধভাবে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসীদের সংকট নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দাবি করেছে, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় তথ্যভান্ডার ও প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ায় সংকট মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়েছে। দলটি রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেছে, এই পরিস্থিতির জন্য তার “লজ্জায় মাথা নিচু করা উচিত”।
দলটির নেতা স্যার এড ডেভি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তিতে যুক্তরাজ্যের যোগ দেওয়া উচিত। তার মতে, এতে ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো, ইউরোড্যাক আঙুলের ছাপভিত্তিক ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার পাওয়া এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
এড ডেভি অভিযোগ করেন, ব্রেক্সিটের অন্যতম মুখ নাইজেল ফারাজ এখন যে ছোট নৌকা সংকট নিয়ে রাজনৈতিক লাভ তুলতে চাইছেন, সেই সংকট তৈরিতে তারও ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, “ফারাজ ও কনজারভেটিভরা খারাপ ব্রেক্সিট চুক্তির মাধ্যমে আমাদের সীমান্ত ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। ক্ষমা চাওয়ার বদলে তারা এখন সেই সংকটকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।”
মাইগ্রেশন অবজারভেটরির গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা বলেছে, ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে আসা অনেক অভিবাসী মনে করেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর প্রত্যাবাসন চুক্তি না থাকাই তাদের যুক্তরাজ্যে আসার অন্যতম কারণ। বিশেষ করে যাদের অন্য ইইউ দেশে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য শেনজেন ইনফরমেশন সিস্টেম (SIS) এবং ইউরোড্যাক ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার হারিয়েছে। কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, এই তথ্যভান্ডারে আবার প্রবেশাধিকার পেলে যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথা, তাদের দ্রুত শনাক্ত করা সহজ হবে এবং দণ্ডপ্রাপ্ত মানবপাচারকারীদের তথ্যও কার্যকরভাবে যাচাই করা যাবে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র ম্যাক্স উইলকিনসন বলেন, ফারাজ ও তার সহযোগীরা বারবার নতুন পরিকল্পনার কথা বললেও সংকটের মূল কারণ স্বীকার করতে চান না। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন চুক্তিতে যোগ দিলে একই সঙ্গে মানবিক ও কম ব্যয়বহুল আশ্রয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক এক বিবিসি তদন্তে অন্তত ১৫টি এমন ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে সীমান্তে তথ্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরাও যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন। এই ঘটনাগুলো সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইইউর নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তিতে আশ্রয়প্রার্থীদের বাধ্যতামূলক যাচাই, তারা প্রথম যে ইউরোপীয় দেশে প্রবেশ করেছেন সেখানেই আশ্রয়ের আবেদন করার বাধ্যবাধকতা এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রী আনা টার্লি সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসায় ছোট নৌকার সংকট মোকাবিলা আরও কঠিন হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টার্লি আরও বলেন, ব্রেক্সিটের পর অভিবাসনের চাপ বেড়েছে এবং যুক্তরাজ্য ডাবলিন কনভেনশনের বাইরে চলে যাওয়ায় অন্য ইউরোপীয় দেশ হয়ে আসা অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে সরকার বলছে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হচ্ছে। হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর ছোট নৌকায় আগমন ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। নির্বাচনের পর থেকে ৪৭ হাজারের বেশি অবৈধ পারাপারের চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে এবং ১ হাজার ১০০টির বেশি নৌকা ও ইঞ্জিন জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রান্সের সঙ্গে ফলাফলভিত্তিক নতুন চুক্তির আওতায় ফরাসি উপকূলে ৪০ শতাংশ বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হচ্ছে, যাতে মানবপাচার চক্রের তৎপরতা আরও দমন করা যায়।
সূত্রঃ মিরর
এম.কে

