যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার নিয়মে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ ব্যবস্থায় অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের প্রাথমিক সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার কথা বলা হয়েছে। তবে নতুন ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপ এখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে বর্তমানে পাঁচ বছরের রুটে থাকা অভিবাসীদের জন্য নতুন নিয়ম কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় শুধু নির্দিষ্ট সময় যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেই স্থায়ী হওয়ার সুযোগ মিলবে না। আবেদনকারীর চরিত্র, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, ব্রিটিশ সমাজে একীভূত হওয়ার সক্ষমতা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান বিবেচনা করা হবে। এসব বিষয়কে ভিত্তি করে নির্ধারিত ১০ বছরের সময়সীমা কমানো বা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবনায় উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য দ্রুত স্থায়ী হওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। যেমন, আবেদনের আগের টানা তিন বছর বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার ১৪০ পাউন্ড করযোগ্য আয় থাকলে সাত বছর পর্যন্ত সময় কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে বছরে ৫০ হাজার ২৭০ পাউন্ড আয় থাকলে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় কমতে পারে। নির্দিষ্ট সরকারি সেবামূলক পেশায় পাঁচ বছর কাজ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও সময় কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব ছাড়ের শর্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে এসে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকারি ভাতা গ্রহণ, ভিজিট ভিসায় প্রবেশ করে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী হওয়ার আবেদন কিংবা ছয় মাস বা তার বেশি সময় ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করে অবস্থানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় যুক্ত হতে পারে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে। আর আরকিউএফ লেভেল ৬-এর নিচের দক্ষতার পেশায় কর্মরত কিছু স্কিলড ওয়ার্কারদের জন্য ১৫ বছরের প্রাথমিক সময়সীমার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম কার্যকর হলে যারা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন এবং বর্তমান পাঁচ বছরের নিয়ম অনুযায়ী আইএলআরের যোগ্যতা অর্জনের কাছাকাছি, তাদের কীভাবে বিবেচনা করা হবে—এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। এ জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা বা ট্রানজিশনাল অ্যারেঞ্জমেন্টের দাবি উঠেছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিও সরকারকে এ বিষয়ে স্পষ্ট সুরক্ষা ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করেছে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়মের কারণে যারা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন, তাদের ওপর যেন আকস্মিক বিরূপ প্রভাব না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে এই সুপারিশ নিজে কোনো আইন নয় এবং পাঁচ বছরের রুটে থাকা সবাই পুরোনো নিয়মে আইএলআর পাবেন—এমন নিশ্চয়তাও নয়।
২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে দেওয়া এক লিখিত জবাবে সরকার জানায়, আর্নড সেটেলমেন্ট নিয়ে জনমত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ১২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। সরকার ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুই লাখের বেশি মতামত পেয়েছে। এসব মতামত বিশ্লেষণের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চূড়ান্ত নীতিমালা নির্ধারণ করবেন এবং সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানানো হবে।
আর্নড সেটেলমেন্টের প্রস্তাবের পাশাপাশি আইএলআরের ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে ইমিগ্রেশন রুলসে যুক্ত হয়েছে। ২০২৭ সালের ২৬ মার্চ থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটি অভিবাসন রুটের আবেদনকারীদের স্থায়ী বসবাসের সময় ইংরেজিতে সিইএফআর বি২ পর্যায়ের দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। এর আওতায় স্কিলড ওয়ার্কার, গ্লোবাল ট্যালেন্ট, স্কেল-আপ, ইনোভেটর ফাউন্ডারসহ একাধিক রুট রয়েছে। এই পরিবর্তন বর্তমান নিয়মে পাঁচ বছরের রুটে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
এদিকে, যুক্তরাজ্যে অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ই-ভিসা বা ডিজিটাল ভিসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে ই-ভিসা হলো অভিবাসন স্ট্যাটাসের ডিজিটাল প্রমাণ; এটি আইএলআরের যোগ্যতার সময়সীমা পরিবর্তনের সঙ্গে এক বিষয় নয়।
বর্তমান পাঁচ বছরের রুটে থাকা অভিবাসীদের তাই নিজেদের ভিসার ধরন, যুক্তরাজ্যে বসবাসের সময়, অনুপস্থিতির হিসাব এবং ইংরেজি ভাষার শর্ত যাচাই করা জরুরি। আইএলআরের যোগ্যতা পূরণ হয়ে থাকলে বর্তমান ইমিগ্রেশন রুলস অনুযায়ী আবেদন করার বিষয়ে নিবন্ধিত ইমিগ্রেশন আইনজীবী বা উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার আগে শুধু ১০ বছরের নিয়মের আশঙ্কায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
সূত্রঃ ইউকে.গভ\ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লিখিত জবাব, হাউস অব কমন্সের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রতিবেদন।
এমকে

