মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল আক্রমণ চালায়, তবে মার্কিন সেনাদের “আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে” এবং আঞ্চলিক মিত্রদেরও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষায়, একদিকে ওয়াশিংটন শান্তি আলোচনার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে গোপনে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত, হামলা অব্যাহত রয়েছে। শত্রুর দুর্বলতা আমরা জানি এবং তাদের সেনাবাহিনীতে আতঙ্কের প্রভাব স্পষ্ট।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কয়েক সপ্তাহব্যাপী একটি সম্ভাব্য স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে। এতে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে হামলা এবং হরমুজ প্রণালীর আশপাশে সামরিক অভিযান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সূত্র মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে “মাস নয়, কয়েক সপ্তাহই যথেষ্ট” হতে পারে। খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানির কেন্দ্র হওয়ায় এটি দখল করলে তেহরানের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ছে। ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট, যেখানে প্রায় ২ হাজার ২০০ সেনা রয়েছে, ইতোমধ্যে অঞ্চলটিতে পৌঁছেছে। পাশাপাশি ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ৩ হাজার প্যারাট্রুপার মোতায়েন করা হয়েছে, যারা দ্রুত আক্রমণ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখলে দক্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মোতায়েনকৃত সেনার সংখ্যা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের চেয়ে সীমিত অভিযান বা আকস্মিক হামলার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে “ছলনামূলক অভিযান” চালিয়ে ইরানকে বিভ্রান্ত করার কৌশলও নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন। তারা হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা এবং সমুদ্রপথে চলাচল স্বাভাবিক করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছেন।
তবে এখনো পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনায় বসেনি। ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন জেডি ভ্যান্স।
হোয়াইট হাউসের অবস্থানও কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে যুদ্ধ কমানোর ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী যুদ্ধে যুক্ত হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
ইতোমধ্যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা জোরদার করেছে। সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১২ জন সেনা আহত হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা একাধিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, স্থল সেনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম। তবে তিনি এটাও বলেছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী সব ধরনের সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখা হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী ও আশপাশের অঞ্চল আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে, নাকি কূটনৈতিক সমাধান আসবে—তা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

