২৩ মার্চ দক্ষিণ গাজায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে গুলি চালিয়ে ১৫ স্বাস্থ্যকর্মীকে হত্যা করেছিল ইসরায়েল। হত্যার পর বুলডোজার দিয়ে নির্মমভাবে ধুলোর নিচে গণকবরে চাপা দেওয়া হয় লাশ। মর্মান্তিক এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসলে ইসরায়েল দাবি করে, অ্যাম্বুলেন্স হেডলাইট ছাড়াই চলছিল এবং হামাস যোদ্ধাদের পরিবহন করছিল।
তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস শনিবার (৫ এপ্রিল) একটি প্রতিবেদনে ভিডিও প্রকাশ করেছে, যাতে দেখা যাচ্ছে, যখন গুলি চালানো হয় তখন ফিলিস্তিনি অ্যাম্বুলেন্স এবং একটি অগ্নিনির্বাপক ট্রাকে স্পষ্টভাবে জরুরি আলো জ্বলছিল।
এই ভিডিওটি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবির বিরোধিতা করে এবং ইসরায়েলি মিথ্যাচারকে প্রকাশ্যে আনে। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের ভিডিও সম্পর্কে উগ্র ইহুদিবাদি সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।
একজন চিকিৎসকের মোবাইল ফোনে ভিডিওটি পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। শুক্রবার জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ভিডিওটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেবেন।
প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকাটি জানিয়েছে, তারা জাতিসংঘের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের কাছ থেকে ভিডিওটি পেয়েছে, যিনি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছিলেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তারা ভিডিওটির সময় এবং স্থান যাচাই করেছে। কূটনীতিকের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, ভিডিওটি ধারণকারী চিকিৎসকের নাম প্রকাশ করা হয়নি, কারণ তার পরিবার ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে প্রতিশোধের ভয় পাচ্ছিল।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অ্যাম্বুলেন্সের একটি বহর এবং একটি দমকলের গাড়ি তাদের জরুরি আলো জ্বলতে জ্বলতে রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। তারপর রাস্তা থেকে লাইনচ্যুত অন্য একটি গাড়ির পাশে এসে থামছে।
ভিডিওটি ধারণকারী ব্যক্তিটি তারপর তার গাড়ি থেকে নেমে আসেন। লাইনচ্যুত গাড়ির দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপর লোকটিকে শাহাদা পাঠ করতে শোনা যায়, যা সাধারণত মৃত্যুর আগে পড়া হয়।
সেই মুহূর্তে, ভিডিওটি অন্ধকার হয়ে যায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, এরপর পাঁচ মিনিট ধরে গুলিবর্ষণ চলতে থাকে।
পত্রিকা জানিয়েছে, এই পাঁচ মিনিটের মধ্যে একজন ব্যক্তিকে আরবিতে বলতে শোনা যায়, এখানে ইসরায়েলিরা আছে। অন্য দিক থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের হিব্রু ভাষায় অস্পষ্ট আদেশ দিতে শোনা যায়।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাজা উপত্যকার দক্ষিণে ধুলোর মধ্যে একটি কবর থেকে রেড ক্রিসেন্ট, জাতিসংঘ এবং হামাস-সংশ্লিষ্ট ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের ১৫ জন চিকিৎসক ও সাহায্যকর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের সাথে ছিন্নভিন্ন অ্যাম্বুলেন্সও রয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী সম্ভবত বুলডোজার দিয়ে তাদের ধুলোর নিচে চাপা দেয়।
শুক্রবার (৪ এপ্রিল) জাতিসংঘের সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের প্রধান ড. ইউনিস আল-খাতিব বলেন, মানবিক-কর্মীদের খুব কাছ থেকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল’ এবং ইসরায়েল মৃতদেহগুলোর অবস্থান সম্পর্কে আট দিন ধরে আমাদের অন্ধকারে রেখেছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হামলার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে নেওয়া স্যাটেলাইট চিত্রগুলো দেখে ইসরায়েলি সেনারা গাড়িগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে একসাথে জড়ো করে রাখে। দুই দিন পর তোলা ছবিতে দেখা যায় যে, গাড়িগুলো মাটিচাপা পড়ে আছে। খন্ডিত মাটির পাশে তিনটি ইসরায়েলি সামরিক বুলডোজার এবং একটি খননকারী যন্ত্রও রয়েছে। এছাড়া গণকবরের উভয় দিকেই বুলডোজারগুলো রাস্তায় মাটির বাধ তৈরি করেছে।
২৩ মার্চ রাফায় আহতদের সাহায্য করতে যাওয়ার পথে এসব চিকিৎসাকর্মী নিখোঁজ হয়ে যায় বলে জানা গেছে। ঘটনা আলোচনায় এলে ২৮ মার্চ ইসরায়েলি বাহিনী অ্যাম্বুলেন্স এবং ফায়ার ইঞ্জিনের ওপর গুলি চালানোর কথা স্বীকার করে বলেছিল, তারা এগুলোকে ‘সন্দেহজনক যানবাহন’ হিসাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে ১৮ মার্চ ইসরায়েল গাজায় তীব্র বোমাবর্ষণ পুনরায় শুরু করার এবং তারপর নতুন করে স্থল আক্রমণ শুরু করার পাঁচদিন পর গণহত্যার ওই ঘটনাটি ঘটেছিল।
সূত্রঃ নিউ ইয়র্ক টাইমস
এম.কে
০৫ এপ্রিল ২০২৫