12.2 C
London
February 21, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

উইন্ডসর ক্যাসেলে আজান, লন্ডনে রাজকীয় ইফতারঃ ব্রিটেনে রমজানের নতুন অধ্যায়

টেমস নদীর তীরের বহুজাতিক নগরী লন্ডনে রমজান এখন কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এক দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক স্থাপত্য, আধুনিক নগরজীবন ও বহুধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে নগরীর রোজা ও ইফতার আয়োজন এক নতুন সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে মুসলিম ঐতিহ্য ব্রিটিশ জনজীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

 

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ উইন্ডসর ক্যাসেলে। প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবার প্রাসাদের সেন্ট জর্জ হলে আয়োজিত হয় রাজকীয় ইফতার এবং ধ্বনিত হয় মাগরিবের আজান। প্রায় ৩৫০ জন ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ এতে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সহায়তা করেন রাজা তৃতীয় চার্লস ও ক্যামিলা, যা ধর্মীয় সহাবস্থান ও রাষ্ট্রীয় সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে নগরীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণেও ইফতার এখন বড় সামাজিক সমাবেশে রূপ নিয়েছে। ফিঞ্চবারি পার্ক মসজিদের সামনে ‘ইফতার স্ট্রিট’ আয়োজনের সময় রাস্তা পরিণত হয় বিশাল দস্তরখানে। প্রায় দুই হাজার মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান নাগরিক একসঙ্গে বসে ইফতার করেন। আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবীদের পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দেয় এবং বর্ণবাদবিরোধী সামাজিক সংহতির প্রতীক হয়ে ওঠে।

পরিবেশ সচেতনতায়ও ব্রিটিশ মুসলিমরা নতুন ধারা তৈরি করেছেন। প্লাস্টিক বর্জন করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পাত্রে খাবার পরিবেশন এখন সাধারণ চর্চা। ক্যামব্রিজ -এ প্রতিষ্ঠিত ইউরোপের প্রথম ‘ইকো-মসজিদ’ সৌরবিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ধর্মীয় স্থাপনার উদাহরণ দিচ্ছে। একই উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে বার্মিংহাম শহরেও।

নগরীর আকাশচুম্বী ভবনেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘ওপেন ইফতার’, যেখানে উচ্চতল ভবনে আজান ও ইফতার আয়োজন ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ক্রীড়াঙ্গনেও রমজানের উপস্থিতি স্পষ্ট—ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব চেলসি এফ.সি তাদের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ স্টেডিয়ামে বড় পরিসরে ইফতার আয়োজন করে। মাঠের কোণে জামাতে নামাজ ও গ্যালারিতে বসে ইফতারের দৃশ্য ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মীয় অনুশীলনের এক নতুন সমন্বয় তুলে ধরে।

লন্ডনের ইফতার মেনুতেও বহুসাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য স্পষ্ট। দক্ষিণ এশীয় বিরিয়ানি, সমুচা ও পাকোড়া, আরবীয় খুবুজ ও ফালাফেল, পাশাপাশি ব্রিটিশ পুডিং ও তুর্কি বাখলাভা একই দস্তরখানে পরিবেশিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতনদের মধ্যে ডাল ও সবজির স্যুপ দিয়ে ইফতার শুরু করার প্রবণতাও বাড়ছে।

তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গ্রীষ্মকালে প্রায় ১৯ ঘণ্টা রোজা রাখতে হয় এবং সরকারি ক্যালেন্ডারে ঈদের ছুটি না থাকায় কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের বাড়তি চাপ সামলাতে হয়। তবুও শহরের আলোকসজ্জা ও জনসম্পৃক্ত আয়োজন মুসলিমদের জন্য উৎসবের আবহ তৈরি করছে।

সমগ্র চিত্রটি ইঙ্গিত দিচ্ছে—যুক্তরাজ্যে রমজান আর শুধুই ধর্মীয় অনুশাসন নয়; এটি এখন বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থান, নাগরিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীকী এক নাগরিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ আল–জাজিরা ডটনেট

এম.কে

আরো পড়ুন

চার দিনের টিউব ধর্মঘটে অচল লন্ডন, যাত্রী ভোগান্তির শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রে গাঁজা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিলের সুপারিশ

এপ্রিলে বাড়ছে যুক্তরাজ্যের চাইল্ড বেনিফিট ও ইউনিভার্সাল ক্রেডিট

অনলাইন ডেস্ক