TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

এআইয়ের ‘ভুল তথ্যে’ আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যানঃ হোম অফিসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ উচ্চ আদালতের

যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এক জ্যেষ্ঠ বিচারক মন্তব্য করেছেন, একটি আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে হোম অফিস সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি ‘হ্যালুসিনেশন’ বা অস্তিত্বহীন তথ্য ব্যবহার করেছে। বিচারকের মতে, অভিযোগটি সত্য হলে এটি হবে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুতর ব্যর্থতার উদাহরণ।

মামলাটি একজন মরক্কোর নারী ও তার সন্তানকে ঘিরে। ওই নারী আদালতে জানান, অল্প বয়সে তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি ধর্ষণ ও দীর্ঘদিনের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। তার দাবি, দেশে ফিরে গেলে প্রভাবশালী ও পূর্বে দণ্ডপ্রাপ্ত তার স্বামীর হাতে প্রাণনাশের ঝুঁকি রয়েছে। এই আশঙ্কার ভিত্তিতেই তিনি যুক্তরাজ্যে আশ্রয় প্রার্থনা করেন।

তবে হোম অফিস তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। প্রত্যাখ্যানপত্রে বলা হয়, মরক্কো তার জন্য নিরাপদ দেশ এবং সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে একটি তথাকথিত কান্ট্রি পলিসি ইনফরমেশন নোট (সিপিআইএন)-এর উল্লেখ করা হয়। প্রথম ধাপের ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালও একই নথির ওপর নির্ভর করে নারীর আপিল খারিজ করে দেয়।

কিন্তু মামলাটি উচ্চতর ট্রাইব্যুনালে গেলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিচারক দেখতে পান, যে নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটির কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জনসমক্ষে এমন কোনো নথি নেই এবং হোম অফিসের নিজস্ব কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমও এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি।

রায়ে বিচারক বলেন, হোম অফিসের প্রত্যাখ্যানপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। তার মতে, যদি নথিটির উল্লেখ এআইয়ের তৈরি ‘হ্যালুসিনেশন’ হয়ে থাকে, তাহলে এটি হোম অফিসের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর ব্যর্থতা। তিনি আরও বলেন, যে নথির অস্তিত্বই নেই, সেটিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ভুয়া প্রমাণের ওপর নির্ভর করার সমতুল্য এবং এটি একটি গুরুতর প্রক্রিয়াগত অনিয়ম।

ঘটনার পর সংবাদমাধ্যম হোম অফিসের কাছে নথিটি চাইলেও প্রথমে তারা এমন একটি সংরক্ষণাগারের লিংক দেয়, যেখানে সেটি পাওয়া যায়নি। পরে তারা ভিন্ন ধরনের একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা উপস্থাপন করে, যার নাম কান্ট্রি ইনফরমেশন নোট (সিআইএন)। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সিআইএন এবং সিপিআইএন এক নয়। বিচারকদের কাছে সাধারণত সিপিআইএন-ই নির্ভরযোগ্য নীতিগত নথি হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও জানা যায়, মরক্কো বিষয়ে সর্বশেষ প্রকাশিত সিপিআইএন ছিল ২০১৭ সালে। অর্থাৎ, হোম অফিস যে ২০২১ সালের নথির উল্লেখ করেছে, তার কোনো প্রকাশিত রেকর্ড নেই। বরং আদালতে পরে উপস্থাপিত অভ্যন্তরীণ নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৮ সালে মরক্কোতে প্রায় ৪০ হাজার শিশুবিয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং দেশটির আইনে বৈবাহিক ধর্ষণকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এমনকি অভিযোগকারী নারীকে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কার কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

এদিকে হোম অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা আশ্রয় ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যালোচনা করে এবং প্রতিটি আবেদন সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। সরকারের দাবি, প্রকৃত সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিদেরই যুক্তরাজ্যে আশ্রয় দেওয়া হয়।

তবে এই মামলায় বিচারকের পর্যবেক্ষণ যুক্তরাজ্যের আশ্রয় আবেদন মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, সরকারি নথির নির্ভরযোগ্যতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিস্তর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মরক্কোর ওই নারীর আশ্রয় আবেদন সংক্রান্ত মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলা ভাষার সম্মানঃ হিথরো বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন বোর্ডে যুক্ত হলো বাংলা বার্তা

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেল সুবিধা বাতিলের ঘোষণা

ব্রিটেনে বেড়েছে চাকরির সুযোগ

নিউজ ডেস্ক