মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি এআই–নির্মিত ভিডিওতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা–কে অবমাননাকর ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়। ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে আসে, যখন ট্রাম্পকে ঘিরে একাধিক বিতর্ক—বিশেষ করে তথাকথিত এপস্টিন সংশ্লিষ্ট ইস্যু—নিয়ে জনমনে প্রশ্ন বাড়ছিল।
ভিডিওটি প্রকাশের পর হোয়াইট হাউস দাবি করে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে এটি একজন নামহীন কর্মী পোস্ট করেছিলেন। তবে সমালোচকদের মতে, প্রেসিডেন্ট নিজে একই সময়ে অনলাইনে সক্রিয় থাকায় এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ঘটনাটি কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাসচর্চার মাসে প্রকাশ পাওয়ায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।
এদিকে, একই সময় আরেকটি ঘটনায় সশস্ত্র ফেডারেল এজেন্টরা সাংবাদিক ডন লেমন–কে একটি হোটেলকক্ষ থেকে গ্রেপ্তার করে বলে অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস ফিলাডেলফিয়ায় দাসপ্রথা–সংক্রান্ত একটি প্রদর্শনী সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সমালোচকদের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের কিছু ভোটকেন্দ্রের ব্যালট জব্দের উদ্যোগও একই ধারার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই কেন্দ্রগুলোতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। ফলে বিরোধীরা এটিকে ভোটাধিকার প্রশ্নে নতুন বিতর্ক হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সমালোচকদের একটি বড় অংশের ধারণা, ট্রাম্পের এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল আবেগতাড়িত নয়; বরং পরিকল্পিত। যখন কোনো নেতিবাচক সংবাদচক্র দীর্ঘায়িত হয়, তখন তিনি নতুন ও আরও চাঞ্চল্যকর বিতর্ক তৈরি করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সরিয়ে দেন। এতে গণমাধ্যমের মনোযোগ বিভক্ত হয় এবং বিরোধী শিবির প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মূল ইস্যুতে ধারাবাহিকতা হারায়।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ‘বিভ্রান্তির রাজনীতি’। ট্রাম্প প্রায়ই এমন ইস্যু উত্থাপন করেন, যা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তার সমর্থকদের মধ্যে ‘আমরা বনাম তারা’ মনোভাবকে জোরদার করে। এতে তার রাজনৈতিক ভিত্তি সংহত থাকে, যদিও জাতীয় পর্যায়ে সমালোচনা বাড়ে।
সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক সামনে এসেছে। মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, ভেনেজুয়েলা–সংক্রান্ত নীতি, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে পূর্বের বিতর্কিত মন্তব্য—এসব ইস্যু থেকে জনদৃষ্টি সরে গিয়ে নতুন বিতর্কে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল–কে প্রকাশ্যে সমালোচনা, বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথ–কে লক্ষ্য করে মন্তব্য, এমনকি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো পদক্ষেপও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কি ইচ্ছাকৃতভাবে ধারাবাহিক বিতর্ক তৈরি করে জনআলোচনার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছেন? নাকি এগুলো কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া? বিশ্লেষকদের মতে, যত দিন পর্যন্ত বিরোধীরা এই কৌশলগত দিকটি অনুধাবন করে সুসংহত প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে না পারবেন, তত দিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বারবার বদলে যাবে এবং মূল ইস্যুগুলো চাপা পড়ে যাবে।
লেখকঃ
জেফরি সোনেনফেল্ড ইয়েল স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের লেস্টার ক্রাউন অধ্যাপক।
স্টিভেন তিয়ান ইয়েল চিফ এক্সিকিউটিভ লিডারশিপ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক।
সূত্রঃ টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

