যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই নিউইয়র্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। প্রায় এক বছর পর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। একই সময়ে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের দেওয়া শর্তের জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে চার থেকে পাঁচ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত মিলিব্যান্ড-আরাগচি বৈঠকটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চরমে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হবে না।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে চার থেকে পাঁচ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে শর্তগুলো ‘সম্পূর্ণভাবে এবং একই সঙ্গে’ বাস্তবায়ন করতে হবে। এরপর ইরান পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। তবে সেই পদক্ষেপ কী হবে, তা তিনি প্রকাশ করেননি।
রেজাই আরও বলেছেন, এখন আর শুধু আলোচনার সময় নেই; যুক্তরাষ্ট্রকেই আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত পূরণ না করলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না এবং আলোচনার পথও বন্ধ থাকবে।
এর আগে চলতি সপ্তাহেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে তিন ঘণ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কাতারের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই আলোচনাকে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করতে সতর্ক করেছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ড ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। বৈঠকে মিলিব্যান্ড স্পষ্ট করেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তরাজ্য এবং লন্ডন সংকটের কূটনৈতিক সমাধান চায়। একই সঙ্গে ইয়েমেনে যুক্তরাজ্যের মিত্র সৌদি আরবের প্রতি সমর্থনের কথাও জানান তিনি।
তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অবস্থান পুরোপুরি নরম হয়নি। মিলিব্যান্ড যুক্তরাজ্যে ইরানের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ তুলে তিনি তেহরানকে সতর্ক করেন। পাশাপাশি ইরানে ১০ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া ব্রিটিশ দম্পতির সঙ্গে ব্রিটিশ কনস্যুলার কর্মকর্তাদের যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
এই বৈঠকটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করেছিল। এর ফলে দুই দেশের আগে থেকেই খারাপ সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। সেই ঘটনার পর নিউইয়র্কে মিলিব্যান্ড ও আরাগচির বৈঠককে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মানদাব প্রণালি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা হরমুজ সংকটের সঙ্গে ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বাব আল-মানদাবের বিষয়টি যুক্ত করেছেন।
ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল রহিম সাফাভি সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাবকে কেন্দ্র করে নতুন যুদ্ধফ্রন্ট তৈরি হতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। সংকটের প্রভাবে বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৭ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার অবস্থান তুলে ধরলেও কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খোলা রাখার বার্তা দেন। তিনি শক্তির ভাষার পরিবর্তে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেন।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

