ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও শিল্প সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় সম্ভাব্য কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। দেশটির সরকার টিসাইডে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ CO₂ উৎপাদনকারী কারখানা পুনরায় চালু করতে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
টিসাইডের উইল্টন ইন্টারন্যাশনাল শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত এই কারখানাটি পরিচালনা করে এনসাস। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এটি অচল করে রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সরকার এটিকে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড খাদ্য ও পানীয় শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি জবাইয়ের সময় পশুকে অচেতন করতে, খাদ্য প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে এবং কার্বনেটেড পানীয় উৎপাদনে অপরিহার্য। ফলে CO₂ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারখানাটি মূলত বায়োইথানল উৎপাদন করে, যার উপজাত হিসেবে CO₂ উৎপন্ন হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তির ফলে আমেরিকান ইথানল আমদানির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়।
এছাড়া ইউরোপজুড়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ বেড়েছে। উল্লেখ্য, এসব প্রতিষ্ঠানও উপজাত হিসেবে CO₂ উৎপাদন করে থাকে। ফলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি CO₂ সরবরাহেও পড়েছে।
যুক্তরাজ্যের ব্যবসা বিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল জানিয়েছেন, এই বিনিয়োগ দেশের সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করবে এবং খাদ্য উৎপাদন, পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সুরক্ষা দেবে। একই সঙ্গে এসব শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানও রক্ষা পাবে।
এনসাস ইউকের চেয়ারম্যান গ্রান্ট পিয়ারসন এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি শুধু কোম্পানির কর্মীদের জন্যই নয়, বরং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগ টিসাইড অঞ্চলের শিল্প অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে এবং জৈব CO₂ সরবরাহে দেশের সক্ষমতা বাড়াবে। খাদ্য ও পানীয় খাত ছাড়াও হাসপাতাল, জবাইখানা এবং পারমাণবিক শিল্পেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
কারখানাটিতে সরাসরি প্রায় ১০০ জন কর্মী কাজ করেন এবং এটি যুক্তরাজ্যজুড়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তেহরান হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়ে থাকে।
এর আগেও ২০২১ সালে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে যুক্তরাজ্যের খাদ্য ও পানীয় শিল্প CO₂ সংকটে পড়েছিল। পরবর্তী বছরেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, যা সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বিনিয়োগ শুধু একটি কারখানা চালুর সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য শিল্প সংকট মোকাবিলায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

