18.4 C
London
September 24, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

কেয়ার খাতে স্পনসর লাইসেন্স বাতিলে কড়াকড়িঃ প্রশাসনিক ভুলেও বিপাকে বিদেশি কর্মীরা

যুক্তরাজ্যের কেয়ার খাতে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগে স্পনসর লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হোম অফিসের নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়া বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লাইসেন্স বাতিলের ঘটনাগুলোর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের শোষণ বা কম বেতন দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি রিপোর্টিংয়ে ব্যর্থতা, রাইট টু ওয়ার্ক যাচাইয়ের ভুল এবং অন্যান্য কমপ্লায়েন্স ঘাটতির বিষয়ও উঠে আসছে বলে অভিবাসন আইনবিষয়ক ওয়েবসাইট ফ্রি মুভমেন্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

হোম অফিসের এই কড়াকড়ির অন্যতম লক্ষ্য হলো বিদেশি সামাজিক কেয়ার কর্মীদের শোষণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। ২০২৪ সালের নভেম্বরে কেয়ার বিষয়ক মন্ত্রী স্টিফেন কিনক বলেছিলেন, অনৈতিক নিয়োগকারীদের কারণে বিদেশি সামাজিক কেয়ার কর্মীদের শোষণ ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে এবং এ ধরনের নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আগের ১২ মাসে স্কিলড ওয়ার্কার স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের সংখ্যা ৪ হাজার ৪০৩-এ পৌঁছেছে। তবে এসব লাইসেন্স বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশিত পরিসংখ্যানে আলাদাভাবে দেখানো হয়নি। ফলে কতগুলো ক্ষেত্রে শোষণ বা বেতনসংক্রান্ত অনিয়ম এবং কতগুলো ক্ষেত্রে অন্যান্য কমপ্লায়েন্স সমস্যার কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা সরকারি পরিসংখ্যান থেকে সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না।

ফ্রি মুভমেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি শুরু হচ্ছে হোম অফিসের স্পনসর অ্যাসিওরেন্স টিমের একটি ই-মেইলের মাধ্যমে। সেখানে কোনো স্পনসরকৃত কর্মীর বেতন কোস বা সার্টিফিকেট অব স্পনসরশিপে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে মিলছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি আগের কয়েক মাসের বেতনসংক্রান্ত নথি এবং কর্মীদের অনুপস্থিতির তথ্যও চাওয়া হতে পারে।

কোনো কর্মীর বেতন কম হওয়ার কারণ যদি অসুস্থতার ছুটি বা মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো অনুমোদিত অনুপস্থিতি হয়, তাহলে স্পনসর সেই তথ্য স্পনসর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে যথাযথভাবে রিপোর্ট করেছে কি না, সেটিও হোম অফিস যাচাই করতে পারে।

ফ্রি মুভমেন্টের বিশ্লেষক লুইস ম্যাকউইলিয়াম লিখেছেন, কিছু কেয়ার প্রোভাইডার এসব যোগাযোগকে নিয়মিত বেতন যাচাই হিসেবে দেখলেও পরবর্তী পর্যায়ে স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ পেয়ে থাকেন। কিছু ক্ষেত্রে বেতনসংক্রান্ত প্রশ্ন থেকে শুরু হওয়া তদন্ত পরে রাইট টু ওয়ার্ক যাচাই বা অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়েও বিস্তৃত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের রায় এসেছে। মুন ফিশ লিমিটেড বনাম সেক্রেটারি অব স্টেট ফর দ্য হোম ডিপার্টমেন্ট মামলায় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের হাই কোর্ট ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রায় দেয়। আদালত স্পনসর গাইডেন্সের অ্যানেক্স সি১(এএ)-এর ব্যাখ্যা নিয়ে হোম অফিসের অবস্থান পুরোপুরি গ্রহণ করেনি।

মামলাটিতে প্রশ্ন ছিল, কোনো কর্মীর আইনসম্মত বেতনবিহীন ছুটির কারণে প্রকৃত অর্থে কম টাকা পরিশোধ হলে এবং সেই পরিবর্তন আলাদাভাবে রিপোর্ট না করা হলে সেটিকে অ্যানেক্স সি১(এএ)-এর অধীনে বাধ্যতামূলকভাবে স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের কারণ হিসেবে গণ্য করা যাবে কি না।

হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, আইনসম্মত ও সম্মত বেতনবিহীন ছুটির কারণে কম অর্থ পরিশোধ হওয়াকে শুধু সেই কারণে ‘বেতনের পরিবর্তন’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। আদালত আরও দেখেছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে হোম অফিসের বাধ্যতামূলক ক্ষমতা এবং বিবেচনামূলক ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

রায়ে স্পনসরকে যথেষ্টভাবে জানানো হয়েছে কি না এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না—এ ধরনের প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এই রায় স্পনসরদের সব ধরনের রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা বাতিল করেনি।

এর আগে প্রেস্টউইক কেয়ার লিমিটেড ও অন্যান্য বনাম সেক্রেটারি অব স্টেট ফর দ্য হোম ডিপার্টমেন্ট মামলায় ২০২৫ সালে কোর্ট অব আপিল বলেছিল, স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের ক্ষেত্রে হোম সেক্রেটারির ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যবসা, কর্মী বা কেয়ার সেবা গ্রহণকারীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের পৃথক মূল্যায়ন করার সাধারণ বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে এসব বিষয় বিবেচনা করা তার জন্য উন্মুক্ত থাকতে পারে।

স্পনসর লাইসেন্স ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তাদের ওপর উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব রয়েছে। স্কিলড ওয়ার্কার ব্যবস্থার অধীনে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগে প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ, কর্মীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন হোম অফিসকে জানাতে হয়। নিয়ম ভঙ্গ হলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা হোম অফিসের রয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুক্তরাজ্য সরকার বিদেশি কেয়ার কর্মীদের সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ পাউন্ডের একটি আঞ্চলিক তহবিলও রেখেছে। স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের কারণে চাকরি হারানো আন্তর্জাতিক কেয়ার কর্মীদের নতুন ও নৈতিকভাবে পরিচালিত স্পনসরযুক্ত চাকরিতে দ্রুত যুক্ত করতে এই অর্থ ব্যবহারের কথা সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে।

সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক সামাজিক কেয়ার খাতে অভিবাসনবিষয়ক নিয়ম না মানার ঘটনা এবং কর্মী শোষণের ঘটনাও দেখা গেছে। এসব ঘটনায় কিছু কেয়ার প্রোভাইডার আন্তর্জাতিক কর্মীদের স্পনসর করার লাইসেন্স হারিয়েছেন এবং এর ফলে কিছু কর্মী চাকরিহীন হয়ে পড়েছেন।

ফ্রি মুভমেন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকৃত শোষণ এবং প্রশাসনিক বা রিপোর্টিং ভুলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। লেখক মনে করেন, বিদেশি কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও লাইসেন্স বাতিলের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

তবে কেয়ার খাতে স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের প্রতিটি ঘটনা একই কারণে ঘটছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে নেই। হোম অফিসের প্রকাশিত তথ্য মূলত লাইসেন্স বাতিলের সামগ্রিক সংখ্যা দেখায়; প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিস্তারিত কারণ আলাদাভাবে প্রকাশ করে না।

ফলে কেয়ার প্রোভাইডারদের জন্য বেতন, কর্মীর অনুপস্থিতি, রাইট টু ওয়ার্ক যাচাই এবং স্পনসর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে প্রয়োজনীয় তথ্য যথাসময়ে রিপোর্ট করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লায়েন্স দায়িত্ব হিসেবে থাকছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক মুন ফিশ রায় স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের ক্ষেত্রে হোম অফিসের ক্ষমতা প্রয়োগ ও প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতা নিয়ে নতুন আইনি দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট\ যুক্তরাজ্য সরকারের হোম অফিসের সরকারি তথ্য

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে বিনামূল্যে প্রাতঃরাশ চালুর পর অর্থায়ন ঘাটতির বিষয়ে শিক্ষকদের সতর্কতা

সব ঠিক থাকলে খালেদা জিয়াকে মধ্যরাতের পরে অথবা ভোরে লন্ডনে নেওয়া হবে

বাংলাদেশে সহিংসতা বন্ধ করতে বিশ্বকে আহ্বান জানিয়েছেন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস

নিউজ ডেস্ক