ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক আগে নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ (ভিভিআইপি)ঘোষণা করে জারি করা গেজেট এখন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের (বিজি প্রেস) ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে, যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন—এটি সরকারি নির্দেশনার অংশ হিসেবেই করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়, বিশেষ নিরাপত্তা আইন, ২০২১-এর ধারা ২(ক)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা হলো। এর ফলে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পরও এক বছর স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে ২৮ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূস তার সরকারি বাসভবন ত্যাগ করেন। নতুন ঘোষণার ফলে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনি আগামী এক বছর এসএসএফ সুরক্ষা পাবেন।
তবে যে গেজেটের মাধ্যমে তাকে ভিভিআইপি ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে অনুপস্থিত। সাধারণত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সব গেজেট ওই ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত থাকে। বিজি প্রেসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ওয়েবসাইটে গেজেট প্রকাশ না করার নির্দেশনা দেয়, এবং এ ক্ষেত্রেও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে।
ওই প্রজ্ঞাপনে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লা পান্না স্বাক্ষর করেন। পরে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধিমালা, ২০২৫’ জারি করা হয়, যা বিশেষ নিরাপত্তা আইন, ২০২১-এর ১২ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রণীত। ওই বিধিমালায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান উপদেষ্টা ও ঘোষিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কার্যালয়, বাসভবন ও অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তার দায়িত্ব এসএসএফ মহাপরিচালকের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য বিভিন্ন বেষ্টনীতে মোতায়েন করা হবে এবং অনুষ্ঠানস্থলে অস্ত্র বহনে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ থাকবে। দর্শনার্থী, যানবাহন ও অন্যান্য বস্তুর প্রবেশ-বহির্গমনও এসএসএফ নিয়ন্ত্রণ করবে।
ড. ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ের প্রেস সচিব শফিকুল আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এ ক্ষেত্রে কোনো আইন লঙ্ঘন হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক সরকারপ্রধানকে নিরাপত্তা দিতে হলে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন, এবং এই প্রজ্ঞাপন সেই প্রক্রিয়াগত বাধ্যবাধকতার অংশ।
বাংলাদেশে বিদায়ী সরকারপ্রধানদের সাধারণত এসএসএফ সুবিধা পাওয়ার নজির নেই। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর বিরোধী দলে গেলে তারা এসএসএফ সুবিধা পাননি। তবে ২০০১ সালে নির্দলীয় সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে এক বছরের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়েছিল।
সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘোষণা করে এসএসএফ সুরক্ষা দেওয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থানরত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তাকে দৈহিক নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা তুলে দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, ক্ষমতা ছাড়ার আগে ড. ইউনূসকে ভিভিআইপি ঘোষণা এবং সেই গেজেটের অনুপস্থিতি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সবকিছুই আইন ও বিধিমালার কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

