গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে বাসায় অনুমোদনহীনভাবে নামাজের জামাত আয়োজনের অভিযোগে এক বাংলাদেশি প্রবাসীর রেসিডেন্স পারমিট বাতিল করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় গ্রিসে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়ণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রণীত একটি কঠোর আইনের আওতায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অবৈধ উপাসনালয় পরিচালনার বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ। সরকার বিষয়টিকে বিল্ডিং কোড ও জননিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত করলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে ধর্মীয় চর্চার ওপর অতিরিক্ত দমনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ভুক্তভোগীর প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনে তাকে ‘মোহাম্মদ হাসান’ (ছদ্মনাম) হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ৩৪ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে এথেন্সে বসবাস ও কাজ করে আসছিলেন। স্থানীয় প্রবাসী কমিউনিটির সদস্যদের মতে, তিনি কোনো ধর্মীয় নেতা নন; বরং একজন সাধারণ ও সম্মানিত প্রবাসী।
জানা গেছে, এথেন্সের অ্যাজিওস নিকোলাওস এলাকায় ভাড়া নেওয়া একটি বেসমেন্ট ফ্ল্যাটে তিনি পরিচিত কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। বিশেষ করে জুমার নামাজে সেখানে প্রবাসীদের সমাগম হতো। ইউরোপের বিভিন্ন শহরের মতোই, পর্যাপ্ত মসজিদের অভাবে ঘরোয়া পরিবেশে নামাজের ব্যবস্থা করা প্রবাসীদের মধ্যে নতুন কোনো বিষয় নয়।
স্থানীয় এক বাসিন্দার অভিযোগের পর অ্যাজিওস পান্তেলিমনাস থানার পুলিশ ওই বাসায় অভিযান চালায়। অভিযানে স্থানটিকে অনুমোদনহীন উপাসনালয় হিসেবে চিহ্নিত করে সিলগালা করা হয়। পরবর্তীতে অনুমতি ছাড়া নামাজ পরিচালনার অভিযোগে আদালতে হাসানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
পরিস্থিতি আরও গুরুতর রূপ নেয় যখন গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়ণ বিষয়ক মন্ত্রী থানোস প্লেভরিস সদ্য পাস হওয়া ‘ল ৫২২৪/২০২৫’-এর ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগের নির্দেশ দেন। এই আইনে অবৈধ উপাসনালয় পরিচালনার অভিযোগে সরাসরি রেসিডেন্স পারমিট বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। এর আওতায় হাসানের বিরুদ্ধে জারি করা ডিপোর্টেশন আদেশে তাকে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের সুযোগও দেওয়া হয়নি, যা সাধারণত গুরুতর অপরাধীদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার অংশ। কর্তৃপক্ষের দাবি, এথেন্সজুড়ে বহু অনুমোদনহীন নামাজঘর রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই বায়ু চলাচলহীন বেসমেন্টে অবস্থিত এবং অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের মতে, ভোটানিকস এলাকায় অবস্থিত সরকারি মসজিদই মুসলিমদের নামাজের জন্য অনুমোদিত একমাত্র স্থান।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই যুক্তিকে বৈষম্যমূলক ও বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন বলে আখ্যা দিয়েছে। হেলেনিক লিগ ফর হিউম্যান রাইটস-এর এক প্রতিনিধি বলেন, এটি অপরাধ দমনের চেয়ে বরং দারিদ্র্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপরাধে পরিণত করার শামিল। তার মতে, কেবল নামাজের জায়গা দেওয়ার কারণে কাউকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা ধর্মীয় স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সংগঠনগুলোর আরও দাবি, এথেন্সের বিশাল আয়তনের তুলনায় একটি মাত্র সরকারি মসজিদ সব মুসলমানের জন্য কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী প্রবাসীদের পক্ষে প্রতিদিন বা জুমার দিনে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করে নামাজ আদায় করা বাস্তবসম্মত নয়।
এই ঘটনায় গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ঘরোয়া পরিবেশে কয়েকজন মিলে নামাজ আদায় করলেও তারা আইনি জটিলতা ও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
হাসানের আইনজীবীরা ডিপোর্টেশন আদেশের বিরুদ্ধে জরুরি আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, একটি প্রশাসনিক নিয়মভঙ্গের শাস্তি হিসেবে দেশান্তর সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অনুপাতহীন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় গ্রিসে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে হাসানের ভবিষ্যৎ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনের অভিযোগে একজন বৈধ অভিবাসীকে দেশত্যাগে বাধ্য করার এই ঘটনা গ্রিসের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অভিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এম.কে

