চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে “চরম বোকামি” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং একে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে নিজের অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এ নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও তীব্র আলোচনা চলছে।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ভারত মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপমালা, যা যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ মাইল দূরে এবং মরিশাসের উত্তর-পূর্বে প্রায় ১ হাজার ২৫০ মাইল অবস্থান করছে। নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ১৮১৪ সালের প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে মরিশাসের সঙ্গে এই দ্বীপগুলো ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ১৯৬৫ সালে মরিশাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দ্বীপগুলোকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ওশান টেরিটরি ঘোষণা করা হয়, যদিও মরিশাস ১৯৬৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।
ব্রিটিশ ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক স্বার্থের অংশ হিসেবে চাগোসের সবচেয়ে বড় দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। ওই সময় দ্বীপের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক মরিশাস ও সেশেলসে পুনর্বাসন করা হয়, আর ২০০২ সালে কিছু মানুষ যুক্তরাজ্যে বসবাসের সুযোগ পান।
১৯৮০-এর দশক থেকে মরিশাস দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপন করে। ২০১৯ সালে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায়ে জানায়, মরিশাসের উপনিবেশমুক্তকরণ প্রক্রিয়া আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়নি এবং যুক্তরাজ্যের উচিত দ্রুত দ্বীপগুলোর প্রশাসন শেষ করা।
২০২২ সালে তৎকালীন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের নেতৃত্বাধীন সরকার মরিশাসের সঙ্গে সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনায় বসার ঘোষণা দেয়। যুক্তরাজ্য সরকার দাবি করে, আন্তর্জাতিক আইনি চ্যালেঞ্জ এড়াতে এবং প্রতিরক্ষা স্বার্থ রক্ষায় আইনি নিশ্চয়তা জরুরি। কনজারভেটিভ সরকার মোট ১১ দফা আলোচনা চালায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি জয়ী হওয়ার পর ৩ অক্টোবর দুই দেশ যৌথভাবে রাজনৈতিক সমঝোতার ঘোষণা দেয়। ২০২৫ সালের ২২ মে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী নবীন রামগুলাম আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। স্টারমার বলেন, আইনি লড়াইয়ে যুক্তরাজ্যের জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা ছিল না এবং দ্রুত অন্তর্বর্তী আদেশ আসতে পারত।
চুক্তি অনুযায়ী মরিশাস দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব পাবে, তবে যুক্তরাজ্য ডিয়েগো গার্সিয়ায় ৯৯ বছরের জন্য লিজ বজায় রাখবে, যা প্রয়োজনে বাড়ানো যাবে। এই লিজ বাবদ যুক্তরাজ্যের বার্ষিক ব্যয় গড়ে প্রায় ১০১ মিলিয়ন পাউন্ড এবং মোট আর্থিক প্যাকেজের বর্তমান মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন পাউন্ড।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানায়, বিস্তৃত পর্যালোচনার পর তারা নিশ্চিত হয়েছে যে এই চুক্তি ডিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম নিশ্চিত করবে। তবে ব্রিটিশ কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক ও সংস্কারপন্থী নেতারা এটিকে “আত্মসমর্পণ” বলে অভিহিত করেছেন এবং মরিশাসের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলেছেন।
এই চুক্তি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রসঙ্গ তোলেন। এর জবাবে কিয়ার স্টারমার বলেন, মিত্রদের বিরুদ্ধে শুল্কের হুমকি সম্পূর্ণ ভুল। তবে দুই নেতার সাম্প্রতিক ফোনালাপ আশানুরূপ হয়নি বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

