জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চা উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্রিটেনে জনপ্রিয় পানীয় চায়ের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্রিটেনের সুপারমার্কেটগুলোতে বিক্রি হওয়া কালো চায়ের বড় একটি অংশ আসে কেনিয়া থেকে। দেশটির চা উৎপাদনকারী কৃষকেরা এখন অনিয়মিত আবহাওয়া, কম উৎপাদন, চায়ের মানের পরিবর্তন এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মুখে পড়েছেন। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে চায়ের দামও বেড়েছে।
কেনিয়া ব্রিটেনে ব্যবহৃত মোট কালো চায়ের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করে। ফলে দেশটির চা উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব ব্রিটিশ বাজারেও পড়তে পারে। চলতি বছরের মে ও জুন মাসে কেনিয়ার পাঁচটি চা উৎপাদনকারী সমবায়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চা উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
কেনিয়ার চা উৎপাদনকারী অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। জানুয়ারিতে সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়া থাকার কথা থাকলেও ওই মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবার জুলাইয়ে তুলনামূলক ঠান্ডা থাকার কথা থাকলেও তাপমাত্রা ছিল প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। এমন পরিবর্তন চা উৎপাদনের পরিমাণ ও মান—দুটির ওপরই প্রভাব ফেলছে।
ফিনটিয়া ইউনিয়নের ব্যবস্থাপক নেলসন এনজেনো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কৃষকদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর হয়ে উঠেছে।
একই সময়ে চা উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের খরচও বাড়ছে। উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে চায়ের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব ব্রিটেনের ভোক্তাদের চা কেনার খরচেও পড়ছে।
শুধু কেনিয়ার চা উৎপাদন নয়, ব্রিটেনের নিজস্ব কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চলতি বছরের আবহাওয়ার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কৃষকেরা গ্রীষ্মের খরার কারণে খারাপ চারণভূমি, কম ফসল এবং গবাদিপশুর ওপর অতিরিক্ত তাপের চাপের মুখে পড়েছেন।
চলতি গ্রীষ্মে ব্রিটেনে রেকর্ড উষ্ণ আবহাওয়া দেখা গেছে। এ সময়ে পাঁচটি তাপপ্রবাহ ঘোষণা করা হয় এবং দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাগানে পাইপ দিয়ে পানি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। খরা ও অতিরিক্ত তাপের কারণে দুধ উৎপাদন ও সংগ্রহের ওপরও প্রভাব পড়েছে।
কৃষি ও উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সপ্তাহের তুলনায় দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার লিটার বা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি ব্যবসা তখন স্কটল্যান্ডের উৎপাদকদের কাছ থেকে অর্গানিক দুধ সংগ্রহের দিকে ঝুঁকেছে।
স্কটল্যান্ডভিত্তিক মসগিয়েল অর্গানিক ডেইরির প্রতিষ্ঠাতা ব্রাইস কানিংহাম বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসাগুলোর কাছ থেকে অর্গানিক দুধের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। খরার কারণে পুরো দুগ্ধ শিল্পেই গুরুতর সরবরাহ সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং বছরের এই সময়ে অর্গানিক দুধ পাওয়া এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়ে।
ফল উৎপাদনেও আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব দেখা গেছে। স্কটল্যান্ডে এবার ভালো ফলন হলেও ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে তাপ ও খরার কারণে ফলের বাগানগুলোতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। স্কটল্যান্ডের সাইডার উৎপাদকরাও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
লস্ট অর্চার্ডসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাঙ্গাস মরিসন বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে কোথায় খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব এবং ব্যবসাগুলো কোথা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করবে, তা পরিবর্তন করতে পারে। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
কেনিয়ায় চা উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্রিটেনের কৃষিতে খরা ও তাপপ্রবাহের প্রভাব—দুই দিক থেকেই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। চায়ের ক্ষেত্রে কেনিয়া ব্রিটিশ বাজারের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হওয়ায় দেশটির উৎপাদন পরিস্থিতি ব্রিটেনের বাজারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ
এমকে

