11.7 C
London
October 20, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

জলবায়ু পরিবর্তনে গলছে বরফে জমাট মাটিঃ নরওয়ের শহরে কলের পানি পানে নিষেধাজ্ঞা

নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলের প্রত্যন্ত শহর লংইয়ারবিয়েনে কলের পানি পান না করার নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বছর জমাট থাকা মাটি গলে যাওয়ায় শহরটির পানির উৎসে ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষক মিশছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পানিতে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিষয়ে খবর প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত লংইয়ারবিয়েনের প্রধান পানির উৎস হলো ‘ইসডামেন’ নামে পরিচিত একটি হ্রদ। প্রায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ দিয়ে হ্রদটির পানি আটকে রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পানীয় জলের প্রধান উৎস এই হ্রদ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এর পানির মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শহরটি উত্তর মেরু থেকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে অবস্থিত। বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, এখানে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির তুলনায় পাঁচ থেকে সাত গুণ দ্রুত উষ্ণতা বাড়ছে। শরৎকালে প্রতি দশকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার চার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে দীর্ঘদিন ধরে বরফে জমাট থাকা মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলে যাচ্ছে। এতে মাটির নিচে থাকা শিলাস্তর উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে এবং সেখানকার বিভিন্ন খনিজ ও ধাতু পানির উৎসে মিশে যাচ্ছে।

গবেষকদের মতে, লংইয়ারবিয়েনের পানিদূষণের পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে—পারমাফ্রস্টের গলন এবং এলাকাটির ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। শহরটি একসময় খনিশিল্পের জন্য পরিচিত ছিল। এখানকার শিলায় থাকা পাইরাইট নামের খনিজ পানি ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অম্লতা তৈরি করতে পারে। সেই অম্ল শিলা থেকে বিভিন্ন ভারী ধাতু বের করে পানিতে মিশিয়ে দেয়।

স্বালবার্ড ইউনিভার্সিটি সেন্টারের আর্কটিক ভূতত্ত্বের সহযোগী অধ্যাপক ও পারমাফ্রস্ট বিশেষজ্ঞ মারজোলাইন ভেরেট জানিয়েছেন, গলে যাওয়া পারমাফ্রস্ট এবং পাইরাইটসমৃদ্ধ শেল শিলার সংমিশ্রণ পানির উৎস দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ। লংইয়ারবিয়েনে বিশেষভাবে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় অন্যান্য দূষকও পানিতে মিশতে পারে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে লংইয়ারবিয়েনের প্রায় ২ হাজার ৬০০ বাসিন্দাকে প্রথমবারের মতো সতর্ক করে পৌর কর্তৃপক্ষ লংইয়ারবিয়েন লোকালস্তিরে। পরীক্ষায় পানিতে প্রতি লিটারে ম্যাঙ্গানিজের পরিমাণ পাওয়া যায় ১ হাজার ২৫০ মাইক্রোগ্রাম, যা নরওয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নির্ধারিত ৫০ মাইক্রোগ্রামের প্রস্তাবিত সীমার ২৫ গুণ। শহরের মেয়র টের্জে আউনেভিক বলেন, পলি জমার কারণে পানির মান আগে থেকেই ভালো ছিল না, তবে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার ম্যাঙ্গানিজের সংস্পর্শে থাকলে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও নবজাতকদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কলের পানি সরাসরি পান করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয়ভাবে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একটি স্থানীয় পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ট্যাংক স্থাপন করা হয়। বাসিন্দারা স্থানীয় সুপারমার্কেট থেকে পাত্রে করে বিনা মূল্যে ওই পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। একই সঙ্গে দূষণের উৎস ও কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে পানিতে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা কমে এলেও সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। চলতি বছরের শুরুর দিকে পানিতে সালফেট ও নিকেলের মাত্রাও পানীয় জলের জন্য সুপারিশকৃত সীমা ছাড়িয়ে যায়। ফলে কলের পানি পান না করার নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।

মেয়র টের্জে আউনেভিক বলেন, নরওয়েতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ধরে নিয়েছে যে কলের পানি সরাসরি পান করা নিরাপদ। এখন পানি সংগ্রহ করে বহন করে আনতে হওয়াটা বাসিন্দাদের জন্য কঠিন অভিজ্ঞতা। তার মতে, অন্যান্য ছোট জনবসতিরও নিজেদের পানির উৎসে এমন সমস্যা দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে, তা আগেভাগে পরিকল্পনা করে রাখা প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, লংইয়ারবিয়েনের এই পরিস্থিতি আর্কটিক অঞ্চলের অন্যান্য জনবসতির ভবিষ্যৎ ঝুঁকিরও ইঙ্গিত দিতে পারে। উত্তর কানাডা ও আলাস্কার মতো এলাকাতেও পারমাফ্রস্ট, পাইরাইট এবং ভারী ধাতুসমৃদ্ধ শিলা রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে সেসব অঞ্চলেও মাটির নিচে আটকে থাকা দূষক পানির উৎসে মিশে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বরফ গলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা চরম আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; নিরাপদ পানীয় জলের সরবরাহও এর কারণে হুমকির মুখে পড়তে পারে। লংইয়ারবিয়েনের অভিজ্ঞতা তাই আর্কটিক অঞ্চলের পানির নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির গুরুত্ব তুলে ধরছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখেঃ ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের সম্ভাবনা

মরদেহ গোসল করানোর কাজে কর্মী নিচ্ছে কুয়েত

১০ লাখ ডলারে মিলবে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নাগরিকত্বের সুযোগ