শত শত নিখোঁজ বাংলাদেশিকে শেখ হাসিনার শাসনামলে নদীতে ফেলা হয়েছে এবং গণকবরে দাফন করা হয়েছে—দক্ষিণ এশিয়ার একটি সরকারি তদন্তে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১,৫৬৯টি বিশ্বাসযোগ্য গুম ও অপহরণের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৮৭ জনকে মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকরাও ছিলেন।
কমিশন জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী এসব কর্মকাণ্ড শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং তার শীর্ষ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে চালিয়েছে। শেখ হাসিনা লেবার সাবেক মন্ত্রী তুলিপ সিদ্দিকের খালা। তুলিপ সিদ্দিক এক বছর আগে মন্ত্রিত্ব ছাড়েন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র বিক্ষোভ দমন-পীড়নের ঘটনায় শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিবেদনের তথ্যকে “জঘন্য” হিসেবে অভিহিত করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫১ জন নিখোঁজ ব্যক্তি ফিরে আসেননি এবং মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরও ৩৬টি মরদেহ জোরপূর্বক গুমের পর উদ্ধার করা হয়—অনেক ক্ষেত্রে ‘ক্রসফায়ার’ বা নদী থেকে গুলিবিদ্ধ লাশ হিসেবে।
কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন জানিয়েছেন, ঢাকার জুরাইন এবং মুন্সিগঞ্জে দুটি চিহ্নহীন গণকবর পাওয়া গেছে, যেখানে গুলিবিদ্ধ মরদেহ দাফন করা হয়েছিল। পরিচয় নিশ্চিত করতে গভীর তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন।
তদন্তে উঠে এসেছে, অনেক অপহৃত জামায়াতে ইসলামী বা বিএনপির সদস্য ছিলেন—যারা শেখ হাসিনার বিরোধী দল। রাজনৈতিক পরিচয় জানা ভুক্তভোগীদের প্রায় ৯৭ শতাংশই বিরোধী দলের নেতা-কর্মী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক গুম বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া, যা রাজনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা অভিযান ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। প্রকৃত সংখ্যা রিপোর্টকৃত সংখ্যার তিন থেকে চার গুণ বেশি হতে পারে।
একজন নারী কমিশনকে বলেন, “রাস্তায় হাঁটার সময় আমার ছোট ভাইয়ের মতো দেখতে প্রতিটি মানুষকে খুঁটিয়ে দেখি—যদি সে হয়।”
গত ১৭ নভেম্বর, শেখ হাসিনা ৭৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পান। তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং বিচার থেকে অনুপস্থিত থাকেন। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ দাবি করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়। তুলিপ সিদ্দিককে অনুপস্থিতিতে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, দুর্নীতির অভিযোগে।
বাংলাদেশে আলাদা তদন্তে ঢাকার গণকবর থেকে ডিসেম্বরে মরদেহ উত্তোলন শুরু করা হয়। অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান মো. সিবগত উল্লাহ জানান, সেখানে হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে নিহত অন্তত আটজনের মরদেহ পাওয়া গেছে, যাদের শরীরে গুলির চিহ্ন ছিল।
উচ্চমূল্যের বন্দিদের ঢাকার সেনানিবাসে গোপন ‘আয়নাঘর’ কারাগারে রাখা হতো। বেঁচে যাওয়দের মতে, সেখানে বন্দিদের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা হতো, ঘূর্ণায়মান বিছানায় বেঁধে রাখা হতো, পানির মাধ্যমে নির্যাতন করা হতো এবং সপ্তাহজুড়ে অন্ধকারে রাখা হতো।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী শেখ হাসিনা ও তার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশেই এসব কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। কমিশন মনে করে, “দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এমন ব্যবস্থা শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠদের অজ্ঞাতে চলতে পারে—এমনটা কল্পনাই করা কঠিন।”
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

