মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঘিরে নয়াদিল্লিতে কূটনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প দাবি করেন, মোদি তার সঙ্গে দেখা করতে এসে অনুরোধ করেছিলেন—এ বক্তব্য দিল্লিতে আলোচনার জন্ম দিলেও ভারত সরকার আপাতত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্য নতুন নয় বলে মনে করছে নয়াদিল্লি। এর আগেও তিনি ভারত ও মোদিকে লক্ষ্য করে একাধিক বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, ফলে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ সিদ্ধান্তে মোদি তার ওপর “খুব একটা খুশি নন”।
একই বক্তব্যে ট্রাম্প অ্যাপাচি হেলিকপ্টার সরবরাহ নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভারত নাকি পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি, ভারত ৬৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের অর্ডার দিয়েছে।
তবে দিল্লির সরকারি সূত্রগুলো ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ২৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কিনেছে—এর মধ্যে ২২টি ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য এবং ৬টি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য। সব কটি হেলিকপ্টার ইতোমধ্যেই সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে।
২২টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কেনার প্রথম চুক্তি ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওবামা প্রশাসনের সময় স্বাক্ষরিত হয় এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই সেগুলোর সরবরাহ সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় চুক্তিটি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় সই হয়েছিল। ওই ছয়টি হেলিকপ্টারের সরবরাহে কিছুটা বিলম্ব হলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব কটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের জোরালো জবাব দেওয়ার জন্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপ বাড়লেও কূটনৈতিক মহল সংযম বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এ ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া অনেক সময় “উল্টো ফল” ডেকে আনে, বিশেষ করে যখন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভারতের একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমকে এক সরকারি সূত্র জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিটি মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং ভারতের মনোযোগ থাকা উচিত বাণিজ্য আলোচনা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে।
এর আগেও ২০২৫ সালের আগস্টে ট্রাম্প একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন। তখন তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি করবে না অথবা এমন উচ্চ শুল্ক আরোপ করবে যে ভারতের “মাথা ঘুরে যাবে।” সে সময় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন এবং নিজেকে উত্তেজনা প্রশমনের ভূমিকার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
গত কয়েক মাসে নয়াদিল্লি একাধিক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভুল তথ্য সংশোধন করলেও, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব নেওয়ার বিষয়টি ঠেকাতে পারেনি।
এ প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর লুক্সেমবার্গে প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে আলাপকালে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দূরে থাকা দেশগুলো অনেক সময় নিজেদের ঝুঁকি না দেখে অন্যদের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করে থাকে।
জয়শঙ্করের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা ভারতের সঙ্গে সহযোগিতামূলক আচরণ করে, তাদের সঙ্গে সেই অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। আর যারা পাকিস্তানের মতো আচরণ করে, তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আজকের বিশ্বে দেশগুলো মূলত নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। দূরে বসে অনেকেই পরামর্শ দেয়—কখনো চিন্তাভাবনা করে, কখনো না বুঝে, আবার কখনো স্বার্থপরভাবে। ভারত এসব বাস্তবতা মেনেই সিদ্ধান্ত নেয় এবং এগিয়ে যায়।
সূত্রঃ এনডিটিভি
এম.কে

