মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাজ্যভিত্তিক কর্মী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছে। ২৬ আগস্ট ২০২৬-এর এই সিদ্ধান্তের ফলে সংগঠনটির যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ ও আর্থিক কার্যক্রম কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। একই সঙ্গে সংগঠনটির সঙ্গে অর্থ, পণ্য বা সেবা দিয়ে সহযোগিতা করা মার্কিন নাগরিকদের জন্য নিষিদ্ধ হবে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় সংগঠনটিকে ‘বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই ব্যবস্থার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদ জব্দ করা যেতে পারে এবং মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সংগঠনটির সঙ্গে আর্থিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা নিষিদ্ধ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপটি এসেছে ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত বামপন্থী সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কঠোর নীতি গ্রহণের ধারাবাহিকতায়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, প্যালেস্টাইন অ্যাকশন এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত বা সেগুলোকে উৎসাহিত করেছে, যেগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন মূলত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ, অনুপ্রবেশ ও ভাঙচুরের কর্মসূচির জন্য পরিচিত। বিশেষ করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের ব্রিটিশ স্থাপনাগুলো সংগঠনটির প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। যুক্তরাজ্যও এর আগে সংগঠনটিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করেছে।
যুক্তরাজ্যে সংগঠনটির বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের পেছনে বিশেষভাবে আলোচিত একটি ঘটনা ছিল রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ব্রাইজ নর্টন ঘাঁটিতে প্রবেশ করে দুটি সামরিক বিমানের ক্ষতিসাধন। এরপর ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। সংগঠনটির বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্তের আইনি চ্যালেঞ্জও অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পর প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের কার্যক্রম ব্যাহত করে ফিলিস্তিনি মানুষের জীবন রক্ষা করা। তিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাজ্যেও সংগঠনটির নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ব্রিটিশ আদালত সরকারের নিষেধাজ্ঞার বৈধতা বহাল রাখলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আরও আইনি লড়াই চলছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার বৈধতা নিয়ে যুক্তরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কয়েকজন কর্মী ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনায় যুক্তরাজ্যে দণ্ডিত হয়েছেন। অন্যদিকে, সংগঠনটির সমর্থকেরা দাবি করে আসছেন যে তাদের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ইসরায়েলি অস্ত্রশিল্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অংশ, সন্ত্রাসবাদ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্যও বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ, আর্থিক লেনদেন এবং মার্কিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার আওতা প্রযোজ্য হতে পারে।
এদিকে, একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র আন্তঃদেশীয় সংগঠন ‘মাসার বাদিল’-এর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, সংগঠনটি ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের একটি আড়াল হিসেবে কাজ করছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বামপন্থী রাজনৈতিক সহিংসতা ও ইসরায়েলবিরোধী সক্রিয়তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

