ব্রেক্সিট-পরবর্তী সীমান্ত নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর। নতুন ঘোষণায় বলা হয়েছে, যারা ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকও এবং যুক্তরাজ্যে ইইউ সেটেলমেন্ট স্কিমের আওতায় বসবাসের অধিকার পেয়েছেন, তারা এখন ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছাড়াই তাদের ইইউ পাসপোর্ট ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে ফিরতে পারবেন। এই সিদ্ধান্ত দিয়েছে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সীমান্ত নিয়ম অনুযায়ী, ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে বিমানে ওঠার আগে অবশ্যই ব্রিটিশ পাসপোর্ট অথবা প্রায় ৫৮৯ পাউন্ড খরচে পাওয়া সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট দেখাতে হতো। নতুন এই নিয়ম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়, কারণ এতে অনেক মানুষ বাস্তবে যুক্তরাজ্যে ফিরতে না পারার ঝুঁকিতে পড়েছিলেন।
বিশেষ করে এমন বহু ইইউ নাগরিক সমস্যায় পড়েন যারা দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের পর নাগরিকত্ব পেয়েছেন, কিন্তু তখনও ব্রিটিশ পাসপোর্ট হাতে পাননি। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে তারা বিমানে উঠতে না পারায় কার্যত যুক্তরাজ্যে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন তারা বৈধ ইইউ পাসপোর্ট অথবা ইইউ, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন ও সুইজারল্যান্ডের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন।
নিয়ম পরিবর্তনের এই তথ্য প্রথমে প্রকাশ পায় সরকারের ওয়েবসাইট গভ ডট ইউকের একটি হালনাগাদ নির্দেশনায়। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, বিষয়টি মূল সীমান্ত নীতির পাতায় উল্লেখ করা হয়নি; বরং অপেক্ষাকৃত কম দেখা একটি নাগরিকত্ব সংক্রান্ত পাতায় তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে, ফলে অনেকেই বিষয়টি সময়মতো জানতে পারেননি।
লাতভিয়া-বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিক জেলেনা জানান, নতুন নিয়মের কারণে তার ব্যক্তিগত ভ্রমণ পরিকল্পনা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা সংগঠন দ্য থ্রি মিলিয়নের একটি পোস্ট দেখে নিয়ম পরিবর্তনের খবর জানতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তিনি এখনও ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাননি।
জেলেনা তার ব্রিটিশ স্বামীর সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকায় একটি বড় ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু আগের নিয়ম অনুযায়ী তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরতে পারবেন না ভেবে সিদ্ধান্ত নেন—ভ্রমণ শেষে যুক্তরাজ্যে না ফিরে লাতভিয়ায় গিয়ে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন। তিনি বলেন, নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার পাউন্ড খরচ হয়েছে এবং অতিরিক্ত নথির জন্য আরও প্রায় ৬০০ পাউন্ড দিতে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতির কারণে তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে এবং মানসিক চাপও তৈরি হয়েছে। পরে একটি ইমেইলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে এখন আর ব্রিটিশ পাসপোর্ট দেখানো বাধ্যতামূলক নয়। তবে তিনি মনে করেন, সরকারের পক্ষ থেকে পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।
প্রচারাভিযান সংগঠন দ্য থ্রি মিলিয়ন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে তারা সরকারের যোগাযোগ পদ্ধতির সমালোচনা করেছে।
সংগঠনটির নীতিমালা ও অ্যাডভোকেসি প্রধান মোনিক হকিন্স বলেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর অনেক মানুষ কার্যত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন। এই পরিবর্তন তাদের জন্য স্বস্তি আনলেও এটি দেরিতে এসেছে।
এদিকে আরেক নারী ফ্লোরেন্স জানান, নতুন নিয়মের কারণে তিনি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ফ্রান্সে থাকা তার অসুস্থ বাবাকে দেখতে যেতে পারেননি। তার স্বামী একাই ফ্রান্সে গেলেও তিনি যুক্তরাজ্যে থেকে যান এবং কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরে সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের অভিবাসনমন্ত্রী মাইক ট্যাপ হোম অফিসের যোগাযোগ নিয়ে সমালোচনাকে “অযৌক্তিক” বলে মন্তব্য করেছেন। তবে নিয়ম পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি হোম অফিস।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, দ্বৈত নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ সংক্রান্ত নিয়ম ২০২৪ সালের অক্টোবরেই প্রকাশ করা হয়েছিল। তার দাবি, সেটেলড স্ট্যাটাসধারীদের ক্ষেত্রে মূল নিয়ম অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ভ্রমণের সময় এয়ারলাইন সংস্থাগুলো যাত্রীদের ডিজিটাল ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস যাচাই করে থাকে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

