12.8 C
London
April 4, 2025
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

নতুন মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধঃ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ নাকি হুমকি?

বিশ্বজুড়ে দেশগুলো—যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, মেক্সিকো, চীন, জাপান এবং ভারত—উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। তারা প্রস্তুত প্রতিশোধ নিতে যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বাণিজ্য যুদ্ধ পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যান, যা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

বিশ্ব দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। বুধবার ব্রিটিশ সামার টাইম রাত ৯টা—বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর ২টা—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ব্যাপক শুল্ক পরিকল্পনা প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। হোয়াইট হাউস এটিকে বলছে “মুক্তির দিন”। কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে এটি যেন “বিচারের দিন”।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কানাডা, মেক্সিকো থেকে চীন, জাপান থেকে ভারত—সবাই টানটান উত্তেজনায় রয়েছে। এই দেশগুলো ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে যে, যদি ট্রাম্প তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তারা পাল্টা আঘাত হানবে। যদি এই বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা হবে কঠোর ও বিধ্বংসী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই নতুন শুল্কের অর্থ কী? এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ, এর প্রভাব কেমন হবে বাংলাদেশের উপর, যার শীর্ষ রপ্তানি বাজার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

২০% হার শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। যদি তা হয়, এটি কেবল আরেকটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হবে না—এটি হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি ঘটনা। চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া—যারা সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী—তারা ট্র‍্যাম্পের শুল্ক ঘোষণা নিয়ে এখন বিরল ঐক্য প্রদর্শন করছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের মিত্র কানাডাও ক্ষোভে ফুঁসছে।

অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির বিজনেস স্কুলের অনুমান, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিঘ্নিত হলে ও খরচ বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।

ইতোমধ্যেই বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্বর্ণের দাম বেড়ে ৩,১০০ ডলার প্রতি আউন্স হয়েছে—এটি প্রায় ৪০ বছরে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের মজুদ বাড়াচ্ছে কারণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।

ট্রাম্প “ডার্টি ১৫” দেশের তালিকা তৈরি করেছেন, কিন্তু বাংলাদেশ এতে নেই। তবে এরপরেও বাংলাদেশের উপর ৩৭% পর্যন্ত পালটা শুল্কের ঘোষণা আসতে পারে।

সবকিছু শুরু হয়েছিল ১৮ মার্চ, যখন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে “ডার্টি ১৫” শব্দটি ব্যবহার করেন। তখন থেকেই সবাই জানতে চাইছে—এই তালিকায় কারা আছে?

এই তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এমন দেশগুলো রয়েছে যারা মার্কিন পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে এবং ওয়াশিংটনের ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির জন্য দায়ী।

যদিও আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করা হয়নি, ২০২৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুসারে, চীন সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতির জন্য দায়ী। এরপরই রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, ভারত, থাইল্যান্ড, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া এবং সুইডেন।

“ডার্টি ১৫” তালিকার কাছাকাছিও নেই বাংলাদেশ, যা স্বল্পমেয়াদে একটি সুবিধা হতে পারে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ দিচ্ছে—যারা প্রধানত টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে জড়িত—তখন বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

কিন্তু সত্যিকারভাবে লাভবান হতে হলে, রাজ্জাকের মতে, বাংলাদেশকে পোশাক শিল্প এবং কৃত্রিম তন্তুতে (ম্যান-মেড ফাইবার) বড় বিনিয়োগ করতে হবে।

এটির জন্য শুধু স্থানীয় বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক বাণিজ্যের যুদ্ধক্ষেত্র পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং বাংলাদেশকে এর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনও মনে করেন যে, এই শুল্ক যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ আনতে পারে। তবে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভবান হবে না, কারণ এর পোশাক রপ্তানি মূলত নিম্ন ও মধ্যম মানের, যা চীনের পণ্যের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন।

“চীনের বাজার থেকে অংশ নিতে হলে, বাংলাদেশকে দক্ষতা বাড়াতে হবে, গুণগত মান উন্নত করতে হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে রপ্তানিকারকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উচ্চমানের পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ করতে হবে।”

তবে রাজ্জাক একটি সতর্কতাও উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।

যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে মন্দা দেখা দেয়, তখন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি—যা মোট রপ্তানির ৮৫%—গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পাশাপাশি, পশ্চিমা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা কমে যায়।

অতএব, “ডার্টি ১৫” তালিকা এড়ানো স্বল্পমেয়াদে সুবিধাজনক হতে পারে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা অনুমান করা কঠিন।

সূত্রঃ বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

এম.কে
০৩ এপ্রিল ২০২৫

আরো পড়ুন

নিজ কার্যালয়ের দেয়াল থেকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি সরালেন জাবি অধ্যাপিকা

উপদেষ্টা পরিষদে দায়িত্ব পুর্নবণ্টন, কে কোন মন্ত্রণালয় পেলেন

গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত বিশেষ সেল গঠন