জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির মধ্যে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ তীব্র হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় মামদানিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। এর আগে মামদানি নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কথিত গণহত্যার স্থপতি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত ভিডিওতে নেতানিয়াহু মামদানিকে উদ্দেশ করে বলেন, তার লজ্জা হওয়া উচিত এবং তিনি হামাসকে সমর্থন করছেন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু নিউইয়র্কের ইহুদিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগও করেন। তিনি জানান, জাতিসংঘে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের কর্মকাণ্ডের পক্ষে নিজের বক্তব্য তুলে ধরবেন এবং মামদানির বিরুদ্ধেও কথা বলবেন।
অন্যদিকে, মামদানি সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যদি কাউকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের জন্য চিহ্নিত করে, তাহলে কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত নয়। তবে নিউইয়র্ক সিটির নিজস্বভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা নেই বলেও মামদানি স্বীকার করেছেন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। আদালতের অভিযোগের মধ্যে গাজা যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
মামদানি এর আগে বলেছিলেন, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আইনগতভাবে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে শহরের আইন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরে তিনি স্বীকার করেন, নিউইয়র্ক সিটির হাতে স্বাধীনভাবে এমন গ্রেপ্তার কার্যকর করার ক্ষমতা নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা হবে না।
এদিকে, নেতানিয়াহুর জাতিসংঘ সফর এবার স্বাভাবিক কূটনৈতিক সফরের তুলনায় অনেক বেশি বিতর্কের মধ্যে পড়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিতে প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি সংক্ষিপ্ত সফরে আসছেন। ইসরায়েলের জাতিসংঘ দূত ড্যানি দানন বলেছেন, নেতানিয়াহুর এই সফর গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি নিউইয়র্কে আসবেন।
নেতানিয়াহুর সফরের আগে নিউইয়র্কে তার সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এবং প্রতিবাদ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, বিক্ষোভ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে রাতযাপন না করে জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার পর দ্রুত ইসরায়েলে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তার বিমান নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের পরিবর্তে নিউ জার্সির কোনো সামরিক ঘাঁটি অথবা নিউয়ার্ক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারে। তবে এসব তথ্য ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে।
নেতানিয়াহুর এবারের জাতিসংঘ সফরের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে গাজা যুদ্ধ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মঞ্চে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দিতে চান।
গাজা যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল অবশ্য এসব পরিসংখ্যানের পাশাপাশি গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলে আসছে যে তাদের সামরিক অভিযান হামাসের বিরুদ্ধে পরিচালিত এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও পৃথক মামলা চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করেছে এবং পরবর্তীতে আরও কয়েকটি দেশ ওই মামলায় যুক্ত হয়েছে। ইসরায়েল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গাজা সংকট ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২২ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর আসন্ন বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একদিকে ইসরায়েল তার সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি অভিযোগগুলো নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
নেতানিয়াহু ও মামদানির পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ এপি\রয়টার্স
এমকে

