মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানালেও তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ভ্যান্স জানিয়েছেন, তিনি ইসরায়েলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে চান না। বরং আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে মনোযোগী তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিক মার্ক হ্যালপেরিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ অবস্থান জানান ভ্যান্স। তিনি বলেন, “আমি মার্কিন প্রার্থীদের সমর্থন জানাই, আর এখন আমার মনোযোগ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে।”
নেতানিয়াহুকে সমর্থন করছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, “আমি তাকে সমর্থন করার বিরোধিতাও করছি না, আবার সমর্থনও করছি না।” এর মাধ্যমে ইসরায়েলের নির্বাচনে নিজের নিরপেক্ষ অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।
এর আগে রোববার ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কেউ ইসরায়েলের নেতৃত্বে এলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেরাই পরিস্থিতি সামলাতে হতে পারে। নেতানিয়াহুকে ‘শক্তিশালী, সাহসী ও মেধাবী’ বলেও প্রশংসা করেন ট্রাম্প।
ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সমর্থন জানানোকে তিনি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকর সমর্থনসূচক ঘোষণাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ইসরায়েলের নির্বাচনে সরাসরি পক্ষ নিতে চান না তিনি।
ট্রাম্পের এই ঘোষণায় মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাও বিস্মিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করা এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিক দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, নেতানিয়াহুকে সমর্থনের ঘোষণা তাদের সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে। এর আগে এমন কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
অতীতে অবশ্য বিদেশের নির্বাচনে প্রার্থীদের সমর্থন জানিয়েছেন ভ্যান্স। চলতি বছরের এপ্রিলে হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের পক্ষে প্রচার চালাতে দেশটিতে গিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই নির্বাচনে অরবান পরাজিত হন এবং ১৬ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটে। এ ছাড়া জার্মানিতে ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন ভ্যান্স।
এদিকে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “একসঙ্গে আমরা আমাদের লক্ষ্য পূর্ণ করব।” ইরানের হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করার কথাও বলেন তিনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু বিশ্লেষক ট্রাম্পের এই সমর্থনকে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা চালায়। এর প্রভাব মার্কিন অর্থনীতিতে পড়েছে এবং নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের সমর্থকদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন কমেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ভ্যান্সও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ সব সময় এক নয়। গত জুনে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ইসরায়েল ক্রমেই আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ছে এবং ওয়াশিংটনের শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জনমত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট—কোনোটিই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো অবস্থানে নেই। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে বর্তমানে ৩২টি আসন থাকা লিকুদ পার্টির আসনসংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে বলে জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন জিউইশ পাওয়ার পার্টি তরুণ ভোটারদের মধ্যে সমর্থন বাড়াচ্ছে। দলটি এককভাবে অন্তত আটটি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের অবস্থান—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থনের বিপরীতে ভ্যান্সের নিরপেক্ষ অবস্থান মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে ইসরায়েল নীতি নিয়ে মতপার্থক্যের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এমকে

