17.3 C
London
September 11, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎঃ বছরে মিলতে পারে ৯০ কোটি টাকার কার্বন ক্রেডিট

ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। দেশের প্রথম বড় আকারের বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমবে, অন্যদিকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর স্বীকৃতি হিসেবে কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সম্মতিতে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে এই প্রকল্পের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন একটি ব্যবস্থা তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য দিয়ে এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করলে এর পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানো, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে কার্বন বাজার থেকেও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আমিনবাজার ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বছরে প্রায় ৫২০ কোটি টাকা ব্যয় হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সিটি করপোরেশনের এই ব্যয় কমবে বলেও দাবি করা হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৯০ কোটি টাকার সমপরিমাণ কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, প্রকল্পটিতে চীনের সরাসরি বিনিয়োগ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। চীনের সিএমইসি গ্রুপের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অর্থায়নের সঙ্গে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ডিবিএস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ব্যাংক অব চায়নাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

বিদ্যুতের দাম প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি শুধু প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার হিসাব দিয়ে দেখলে হবে না। তার দাবি, সব হিসাব বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে নামবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কার্বন ক্রেডিট হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো বা অপসারণের বিপরীতে একটি ক্রেডিট অর্জন করা যায়। সাধারণভাবে একটি কার্বন ক্রেডিট এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো বা অপসারণের প্রতিনিধিত্ব করে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্বন ক্রেডিটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ল্যান্ডফিলে জৈব বর্জ্য পচে তৈরি হওয়া মিথেন গ্যাস। নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে মিথেন সংগ্রহ ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা গেলে অনিয়ন্ত্রিত মিথেন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে উৎপাদিত গ্যাস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প তৈরি করা যায়।

এ ধরনের প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি কত পরিমাণ কার্বন-সমতুল্য নিঃসরণ কমাচ্ছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে পরিমাপ, প্রতিবেদন এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকল্পের পদ্ধতি, কার্বন ক্রেডিটের মান, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়মের ওপর ক্রেডিটের আর্থিক মূল্য নির্ভর করবে।

প্রকল্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। চীনে উচ্চ আর্দ্রতাসম্পন্ন বর্জ্য উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক ও কাগজ আলাদা করে জ্বালানি তৈরি এবং পচনশীল বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস উৎপাদনের প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এর মাধ্যমে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে। ল্যান্ডফিলে কাঁচা বর্জ্য জমার কারণে সৃষ্ট দুর্গন্ধ ও দূষণ কমানোর সুযোগও তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ড. আইনুন নিশাত আরও বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য যুক্ত হলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে। সরকারের কার্বন ট্রেডিং নিয়ে পরিকল্পনা এবং প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে এ বিষয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বন সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কার্বন শোষণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি, কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আমিনবাজারের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সূত্রঃ বাসস

এম.কে

আরো পড়ুন

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ ছিলঃ ভারতীয় সেনাপ্রধান

টিউলিপ সিদ্দিকের খালার শাসনামলে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও গণকবরের অভিযোগ উঠল বাংলাদেশে

বাংলাদেশি পর্যটকের অভাবে মানবেতর পরিস্থিতিতে কলকাতার রিকশাচালকরা

নিউজ ডেস্ক