বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না—মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত এই বিধান বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রুল খারিজ করে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রতি রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। রিটে বলা হয়, বহুবিবাহের ক্ষেত্রে সালিশি কাউন্সিলের অনুমতির বিধান সংবিধান ও ধর্মীয় অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বিবাহ বলবৎ থাকা অবস্থায় তিনি সালিশি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া নতুন কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়া সম্পাদিত কোনো বিয়েই মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে নিবন্ধনযোগ্য নয়।
আইনে আরও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি চাইলে নির্ধারিত ফিসহ চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে এবং সেখানে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না—তা উল্লেখ করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতিনিধি মনোনয়নের মাধ্যমে সালিশি কাউন্সিল গঠন করবেন।
সালিশি কাউন্সিল যদি মনে করে প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিসংগত শর্ত পূরণ হয়েছে, তাহলেই কেবল অনুমতি দিতে পারবে। সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সহকারী জজের কাছে রিভিশনের সুযোগ থাকবে, যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
আইনে আরও উল্লেখ রয়েছে, সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্পূর্ণ দেনমোহর তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে বকেয়া ভূমি রাজস্ব হিসেবে আদায়যোগ্য হবে। পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান শুনানিতে বলেন, এখানে নারীর সাংবিধানিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ইসলামে বহুবিবাহের অনুমতি থাকলেও সেখানে সব স্ত্রীদের প্রতি সমান সুবিচারের কঠোর শর্ত রয়েছে, যা বর্তমান আইনে কার্যকরভাবে যাচাই করার সুযোগ নেই। তিনি মালয়েশিয়ার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে আদালতের মাধ্যমে সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে অনুমতি দেওয়া হয়, যা চেয়ারম্যানভিত্তিক ব্যবস্থায় সম্ভব নয়।
এই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। রুলে পারিবারিক জীবন রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে বহুবিবাহ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা এবং স্ত্রীদের মধ্যে সম-অধিকার নিশ্চিত না করে অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়।
রুলের শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুলটি খারিজ করেন। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা বহাল থাকলো বলে জানান আইনজীবী ইশরাত হাসান। তবে তিনি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, রিটটি নারীদের সম্মান, অধিকার এবং পারিবারিক সুরক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে দায়ের করা হয়েছে এবং এটিকে জনস্বার্থে করা রিট হিসেবে গণ্য করা হলো। আদালত আরও উল্লেখ করেন, সালিশি কাউন্সিলের স্ত্রী বা স্ত্রীদের বক্তব্য শোনার ক্ষমতা রয়েছে এবং কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সিভিল জজের কাছে রিভিশন ও পরবর্তীতে হাইকোর্টে রিট করার সুযোগও বিদ্যমান।
আদালত বলেন, সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে দেনমোহর আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে এবং কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান সমাজে সচেতনতা তৈরি করবে। যদিও আইনে অভিযোগকারী নির্দিষ্ট করা হয়নি, তবে প্রচলিত বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী আগের স্ত্রীই অভিযোগকারী হবেন।
রায়ে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার প্রসঙ্গও উঠে আসে, যেখানে বহুবিবাহের জন্য সাত বছরের সাজার বিধান রয়েছে। আদালত বলেন, ইসলামী আইনে পুরুষের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়, ফলে সাজায় পার্থক্য থাকলেও তা বৈষম্যমূলক নয়।
হাইকোর্ট রায়ে সুরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াত এবং বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের একাধিক হাদিসের রেফারেন্স উল্লেখ করেন। পাশাপাশি শাফী ও হানাফি মাজহাবের স্কলারদের অভিমত তুলে ধরে বলা হয়—অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সব স্ত্রীকে সমান মর্যাদা দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে একজন পুরুষের একাধিক বিয়ে করা উচিত নয়।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, তিউনিশিয়া ১৯৫৭ সালে এবং তুরস্ক ১৯২৬ সালেই বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করেছে। এর আগেও হাইকোর্ট সরকারকে বহুবিবাহ আইন সংশোধন বা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তবে বর্তমান কাঠামোয় সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি নাকচ করার ক্ষমতা থাকায় আইনটি বৈষম্যমূলক নয় এবং সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক নয়।
এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট ঘোষণা করেন, বহুবিবাহ সংক্রান্ত বর্তমান আইন সংবিধান পরিপন্থি নয় এবং এ বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করা হলো।
এম.কে

