TV3 BANGLA
ফিচার

বিভিন্ন দেশে ছড়াতে পারে যৌনাঙ্গ আক্রান্তকারী পরজীবী, সতর্ক করলেন বিজ্ঞানীরা

‘স্নেইল ফিভার’ নামে পরিচিত স্কিস্টোসোমিয়াসিস রোগটি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ত্বকের ভেতর দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করা এই পরজীবী দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে নীরবে অবস্থান করে এবং ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ—লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংক্রমণটি বছরের পর বছর শনাক্ত না-ও হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, রোগটির পরজীবীর গঠন ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসছে, যার ফলে এটি নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা অর্জন করছে। এমন প্রেক্ষাপটে ৩০ জানুয়ারি পালিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে, যেখানে দরিদ্র অঞ্চলে বিস্তৃত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীজনিত রোগগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।

এই রোগের মূল বাহক হলো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির শামুক। যে সব পানিতে এই শামুক বসবাস করে, সেখানে পরজীবীর লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। সেই পানিতে গোসল বা সংস্পর্শে এলে লার্ভাগুলো বিশেষ এনজাইম ব্যবহার করে মানুষের ত্বক ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে।

শরীরে ঢোকার পর লার্ভাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে, যার কিছু মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেও অনেক ডিম শরীরের টিস্যুতে আটকে যায়। এসব ডিম ধ্বংস করতে গিয়ে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আশপাশের সুস্থ টিস্যুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে বিভিন্ন অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

বিশেষ করে ডিম যদি তলপেট ও যৌনাঙ্গের আশপাশে আটকে থাকে, তখন ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস দেখা দেয়। এতে দীর্ঘমেয়াদি পেটব্যথা, যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব, এমনকি ক্যানসার ও মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হতে পারে।

সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে এই রোগ নিরাময়যোগ্য। ডব্লিউএইচও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—যেমন ছোট শিশু, কৃষিশ্রমিক ও জেলেদের প্রতি বছর প্রতিরোধমূলক ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, রোগটির নতুন কিছু ধরন প্রচলিত পরীক্ষায় শনাক্ত নাও হতে পারে।

মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়া জানান, মানুষের শরীরের পরজীবী ও প্রাণীর শরীরের পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন ‘হাইব্রিড’ রূপ নিচ্ছে। এসব হাইব্রিড পরজীবী মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই সংক্রমিত করতে সক্ষম, ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

মালাউইতে পরিচালিত এক গবেষণায় মানুষ ও প্রাণীর শরীর থেকে সংগৃহীত পরজীবীর নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় সাত শতাংশ পরজীবী ছিল হাইব্রিড—যা গবেষকদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, এই নতুন পরজীবীগুলো সফলভাবে বংশবিস্তার করছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অধ্যাপক মুসায়া সতর্ক করে বলেন, গবেষণাটি সীমিত এলাকায় করা হলেও এটি বৃহত্তর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভবিষ্যতে হাইব্রিড পরজীবীগুলো পুরোনো ধরনকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, হাইব্রিড পরজীবীগুলো যৌনাঙ্গে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ এসব ডিম সাধারণ পরজীবীর ডিমের মতো দেখতে নয়। ফলে উপসর্গকে অনেক সময় যৌনবাহিত রোগ হিসেবে ভুলভাবে শনাক্ত করা হয়। চিকিৎসা না হলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। বন্ধ্যত্ব, সামাজিক নিগ্রহ ও সন্তান ধারণসংক্রান্ত জটিলতা নারীদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও মানুষের অভিবাসনের ফলে হাইব্রিড পরজীবীগুলো নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ইতোমধ্যে দক্ষিণ ইউরোপের কয়েকটি অঞ্চলে এ ধরনের সংক্রমণের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

ডব্লিউএইচও’র স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেছেন, রোগটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কিছু দেশে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ কমলেও প্রাণীদের শরীরে পরজীবী থেকে যাওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন করে মানব সংক্রমণের ঝুঁকি রয়ে গেছে।

নতুন এই হুমকি মোকাবিলায় ডব্লিউএইচও তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। চলতি বছর প্রাণীদের মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গণহারে ওষুধ বিতরণের ফলে সংক্রমণ ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে, তবে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় এই অগ্রগতি ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডব্লিউএইচও জানায়, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উপেক্ষিত ট্রপিক্যাল রোগ খাতে বৈশ্বিক সহায়তা ৪১ শতাংশ কমেছে, যা ভবিষ্যতে স্নেইল ফিভার নির্মূলের লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।

এম.কে

আরো পড়ুন

অস্ট্রেলিয়ার স্টেডিয়াম বন্ধঃ এক পাখির ডিমের সুরক্ষায় এক মাসের নিষেধাজ্ঞা

দেশে ৯ মাসে ১৫৪ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার, গুলিতে নিহত ১

অনলাইন ডেস্ক

ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা পাশ কাঁটাবেন পুতিন!

অনলাইন ডেস্ক